গ্রাফিক : সময়ের আলো পর্দা কি কেবল নারীর পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি পুরুষের দৃষ্টি ও আচরণও এর অন্তর্ভুক্ত? আমাদের সমাজে পর্দার প্রসঙ্গ উঠলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর পোশাক, চলাফেরা ও শালীনতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অথচ ইসলামে পর্দার বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে প্রথমে পুরুষদের সম্বোধন করে পর্দার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে’ (সুরা নুর : ৩০)। এর পরবর্তী আয়াতে নারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে’ (সুরা নুর : ৩১)। এই বর্ণনার ধারা থেকে স্পষ্ট প্রকাশ পায় যে, শালীন সমাজ গড়ার প্রাথমিক দায়িত্ব পুরুষের চোখের সংযম দিয়ে শুরু হয়, আর নারীর শালীনতায় তা পূর্ণতা পায়। অর্থাৎ পর্দার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়; পুরুষেরও রয়েছে দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখার দায়িত্ব।
এর একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বিদায় হজের ঘটনায়। হজরত ফজল ইবনে আব্বাস (রা.) নবীজি (সা.)-এর পেছনে উটের পিঠে বসা ছিলেন। এ সময় খাশআম গোত্রের এক সুন্দরী নারী মহানবী (সা.)-এর কাছে দ্বীনি বিষয়ে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করতে এলে ফজল (রা.) তার দিকে তাকাতে থাকেন। তখন রাসুল (সা.) ফজল (রা.)-এর মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫১৩)। ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, নারীর প্রতি দৃষ্টির সংযমের বিষয়টিতেও রাসুলুল্লাহ (সা.) গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি হঠাৎ কোনো নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন (সহিহ মুসলিম)। একইভাবে হজরত আলি (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, এক দৃষ্টির পর আরেক দৃষ্টি যেন না দেওয়া হয়; কারণ প্রথম অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি ও পরবর্তী ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি এক বিষয় নয় (সুনানে আবু দাউদ)। এসব নির্দেশনা পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করা যাক, একজন নারী শালীন পোশাক পরে রাস্তায় চলছেন, অথচ কোনো ব্যক্তি তাকে উদ্দেশ করে অশালীন মন্তব্য করছেন কিংবা তার প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, পর্দার শিক্ষা কি শুধু ওই নারীর পোশাকেই সীমাবদ্ধ, নাকি ওই ব্যক্তির দৃষ্টি ও আচরণেও এর প্রতিফলন থাকা উচিত? ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়বদ্ধ। কোনো নারীর পোশাক অন্যের অসদাচরণের অজুহাত হতে পারে না। দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে কোনো নারী পর্দা না করলে তাকেই অনেক সময় সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ নারীর প্রতি অশালীন দৃষ্টি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কিংবা হয়রানির ক্ষেত্রে পুরুষদের দিকটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
পর্দা কেবল বাহ্যিক আবরণের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িত দৃষ্টি-সংযম, শালীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক আচরণ। একজন নারী যেমন শালীনতা বজায় রেখে পর্দা রক্ষা করবেন, তেমনি একজন পুরুষও নিজের দৃষ্টি সংযত রেখে নারীর সম্মান রক্ষা করার মাধ্যমে পর্দা রক্ষা করবেন। সুতরাং পর্দার আলোচনা হোক একতরফা সমালোচনার ঊর্ধ্বে। নারীর পোশাকের পাশাপাশি পুরুষের দৃষ্টি, আচরণ ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়েও সমান গুরুত্বের কথা বলতে হবে। কারণ পর্দা কোনো এক লিঙ্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিধান নয়; এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আত্মসংযম, শালীনতা ও পবিত্রতার শিক্ষা। যে সমাজ নারীর পর্দা নিয়ে সচেতন, কিন্তু পুরুষের দৃষ্টি-সংযম নিয়ে নীরব, সে সমাজ পর্দার প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করতে পারেনি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই