প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩২ পিএম
গ্রাফিক সময়ের আলোমানবজীবন মহান আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য নেয়ামতে পরিপূর্ণ। মাটি, পানি, আলো, বাতাস, বিবেক ও জ্ঞান— সবই মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। অথচ মানুষ এত নেয়ামত ভোগ করেও অনেক সময় মহান আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায়। আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ও তাঁর প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেছে পবিত্র কুরআনের সুরা আর-রহমান। আর-রহমান শব্দের অর্থ পরম করুণাময়। সুরাটির শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর করুণার পরিচয় তুলে ধরেছেন। সুরা আর-রহমান পবিত্র কুরআনের ৫৫তম সুরা। এর আয়াতসংখ্যা ৭৮। এই সুরার অন্যতম বিশেষত্ব হলো— এখানে মহান আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াত ৩১ বার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আয়াতটির অর্থ হলো, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে? বিভিন্ন নেয়ামত ও সৃষ্টির নিদর্শন বর্ণনার পর বারবার এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও জিনকে তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করতে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আহ্বান জানিয়েছেন।
সুরা আর-রহমানের আয়াতগুলোতে ছন্দময় ভাষা, অন্তর্মিল ও অপূর্ব বর্ণনাশৈলী লক্ষ করা যায়। এর শ্রুতিমধুর উপস্থাপন এবং নেয়ামত ও কৃতজ্ঞতার গভীর বার্তার কারণে একে নিয়ামত ও কৃতজ্ঞতার মহাকাব্য হিসেবে অভিহিত করা যায়। সুরাটির ছন্দময় বর্ণনা পাঠকের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সৃষ্টিজগতের প্রতি উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে। হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি জিনিসেরই একটি সৌন্দর্য রয়েছে, আর কুরআনের সৌন্দর্য হলো সুরা আর-রহমান’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ২২৬৫)। এই সুরায় মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতের বিভিন্ন নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সমুদ্রের বিস্ময়কর নিদর্শনের কথাও রয়েছে। সুরাটির ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে দুটি সমুদ্রের মিলন এবং তাদের মাঝখানে অন্তরালের কথা বলা হয়েছে। অনেকেই এর উদাহরণ হিসেবে ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থল, অর্থাৎ মরক্কো ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালির কথা উল্লেখ করেন। সেখানে পানির লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন জলস্তরের বৈশিষ্ট্য আলাদা থাকতে পারে। এ ধরনের প্রাকৃতিক নিদর্শন মানুষকে সৃষ্টিজগতের বিস্ময় নিয়ে চিন্তা করতে
উদ্বুদ্ধ করে।
সুরা আর-রহমানের ফজিলত সম্পর্কে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে সুরা আর-রহমানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করেছিলেন। পরে তিনি জানান, জিনদের সামনেও তিনি এই সুরা তেলাওয়াত করেছিলেন। তখন বলেছিলেন তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে— এই আয়াতের জবাবে বলেছিল, আমরা আমাদের রবের কোনো নেয়ামতকেই অস্বীকার করি না; সব প্রশংসা আল্লাহরই (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস : ৩২৯১)। এই বর্ণনা থেকে আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি এবং তাঁর প্রশংসা করার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। সুরা আর-রহমানের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসংখ্য নেয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং একই প্রশ্ন বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে আহ্বান জানিয়েছেন।
সুরাটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে প্রকাশ করলেই যথেষ্ট নয় বরং তাঁর দেওয়া নেয়ামত সঠিকভাবে ব্যবহার করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায়ের পথে চলাও জরুরি। সৃষ্টিজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, সম্পদের অপচয় রোধ এবং অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসাও নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহারের অংশ। সুরা আর-রহমান আল্লাহর রহমত, নেয়ামত ও মানুষের দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা দেয়। এর ছন্দময় বর্ণনা, নেয়ামতের পুনঃপুন স্মরণ এবং পরকালীন জবাবদিহির বার্তা মানুষকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। এর মর্ম উপলব্ধি করে ব্যক্তিজীবন ও সমাজে বাস্তবায়ন করতে পারলেই কৃতজ্ঞতার প্রকৃত প্রকাশ ঘটবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা