ছবি : সংগৃহীত জান্নাতে পুরুষের সংখ্যা বেশি হবে, নাকি নারীর—এ নিয়ে ইসলামি আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে ভিন্ন ভিন্ন দিক উঠে এসেছে। কোনো হাদিসে জান্নাতে নারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আবার কোনো হাদিসে নারীদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইসলামি পণ্ডিতেরা এসব বর্ণনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজেদের মতো করে।
হাদিসে জান্নাতিদের বৈশিষ্ট্য, জান্নাতে তাদের প্রবেশ এবং তাদের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা থেকে জান্নাতের জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
জান্নাতে প্রথম প্রবেশকারীদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতে প্রথম যে দলটি প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল। পরবর্তী দলের চেহারা হবে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার মতো। তাদের প্রত্যেকের দুজন করে স্ত্রী থাকবে। সৌন্দর্যের কারণে তাঁদের শরীরের মাংস ভেদ করে হাড় ও মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। জান্নাতে কেউ নিঃসঙ্গ থাকবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৪)
এই হাদিসের ভিত্তিতে কেউ কেউ মনে করেন, জান্নাতে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হবে। তবে এ বিষয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে একমত নেই।
জান্নাতে নারীদের সংখ্যা বেশি হবে, নাকি কম?
আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় জান্নাতের প্রথম প্রবেশকারীদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হওয়ার কথা এসেছে। একই বর্ণনায় প্রত্যেক পুরুষের দুজন স্ত্রী থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এ বর্ণনাকে কেন্দ্র করে জান্নাতে নারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের অধিকাংশকেই জাহান্নামে দেখতে পেয়েছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৬২)
এ হাদিসের ভিত্তিতে অনেকে মনে করেন, জাহান্নামে নারীর সংখ্যা বেশি হলে জান্নাতে তাদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কমও হতে পারে। তবে জাহান্নামে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে জান্নাতেও তাদের সংখ্যা কম হবে।
আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে একটি উপত্যকায় ছিলেন। তিনি তাদের একঝাঁক কাকের দিকে তাকাতে বলেন। কাকগুলোর মধ্যে একটি ছিল ধবধবে সাদা, যার ঠোঁট ও পা লাল। এরপর তিনি বলেন, জান্নাতে প্রবেশকারী নারীরা পুরুষদের তুলনায় ওই বিরল সাদা কাকের মতো হবে।
এই বর্ণনাটিকেও জান্নাতে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ার পক্ষে ব্যাখ্যা করা হয়।
ইসলামি পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মতে, জাহান্নামে নারীর সংখ্যা বেশি হলেই যে জান্নাতে তাদের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে কম হবে, তা নিশ্চিত নয়। তার ব্যাখ্যায়, নারীরা জান্নাত ও জাহান্নাম—উভয় জায়গাতেই সংখ্যায় বেশি হতে পারেন। কারণ, দুনিয়াতেও পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি।
ইমাম কুরতুবি এ বিষয়ে আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সুপারিশের আগে জাহান্নামে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। কিন্তু সুপারিশের মাধ্যমে গুনাহগার মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনার পর জান্নাতে নারীর সংখ্যাই বেশি হতে পারে।
শায়খ ড. উমার সুলাইমানের ‘জান্নাত-জাহান্নাম’ গ্রন্থে এ ব্যাখ্যার উল্লেখ রয়েছে। বইটির অনুবাদক মাওলানা আকরাম হোসাইন (পৃষ্ঠা ১০৩)।
জান্নাতে দরিদ্ররা আগে প্রবেশ করবেন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছেন, জান্নাতে প্রবেশকারীদের অধিকাংশই দরিদ্র। ধনীদের হিসাব-নিকাশের জন্য আটকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, জাহান্নামিদের বিষয়ে তখন সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯১৯৬)
এই হাদিসে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে দরিদ্রদের সংখ্যাধিক্যের কথা বলা হয়েছে। তবে এটি নারী ও পুরুষের সংখ্যার তুলনা নয়; বরং জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের অবস্থান সম্পর্কে একটি বর্ণনা।
জান্নাতিদের জীবন হবে পবিত্র ও আনন্দময়
রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের প্রথম প্রবেশকারীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল। সেখানে তাদের থুতু ফেলা, প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজন হবে না। তাদের পানাহারের পাত্র হবে সোনার। চিরুনি হবে সোনা ও রুপার, আর ধূপদানি হবে ঘৃতকুমারীর। তাদের ঘামের সুগন্ধ হবে মেশকের মতো। প্রত্যেকের দুজন স্ত্রী থাকবে। তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ থাকবে না। তারা একে অন্যের প্রতি সম্প্রীতিশীল হবেন এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৪৫)
বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন বহু মানুষ
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তার উম্মতের ৭০ হাজার কিংবা ৭ লাখ মানুষ একসঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাদের প্রবেশের মধ্যে কোনো সময়ের ব্যবধান থাকবে না। তাদের চেহারা হবে চাঁদনি রাতের চাঁদের মতো উজ্জ্বল। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৪৭)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হয়েছিল যে তার উম্মতের ৭০ হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল এবং তাদের হৃদয় হবে একই ব্যক্তির হৃদয়ের মতো। এরপর তিনি আল্লাহর কাছে এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর আবেদন করেন। তখন প্রত্যেকের সঙ্গে আরও ৭০ হাজার করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২)
সব মিলিয়ে, জান্নাতে পুরুষের সংখ্যা বেশি হবে, নাকি নারীর—এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাখ্যায় নারীদের সংখ্যাধিক্যের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, আবার অন্য বর্ণনায় তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তাই এ বিষয়ে একটিমাত্র সিদ্ধান্তকে সর্বসম্মত মত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
সময়ের আলো/এসএকে