গ্রাফিক : সময়ের আলো পৃথিবীতে মানুষকে পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে— একনিষ্ঠভাবে এক আল্লাহর ইবাদত ও গোলামি করা। আল্লাহর একত্ববাদে অন্য কোনো বস্তু বা ব্যক্তির অংশীদারিত্ব সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকাই এর মূল শর্ত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মানবজাতির দৈনন্দিন জীবন সঠিক পথে পরিচালনার লক্ষ্যে আল্লাহ তায়ালা পরিপূর্ণ শরিয়ত প্রদান করেছেন। একজন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সব দিকনির্দেশনা এতে বিদ্যমান। শরিয়ত মূলত মানুষের বাহ্যিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত; তবে বাহ্যিক সব কাজ পূর্ণরূপে ও একনিষ্ঠভাবে আদায়ের জন্য প্রয়োজন অন্তরের পরিশুদ্ধতা, যা ‘তাজকিয়া’ হিসেবে পরিচিত।
‘তাজকিয়া’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো— ‘আত-তাতহির’ বা পবিত্র করা। মানুষের অন্তরকে ‘আখলাকে রজিলা’ (নিন্দনীয় গুণাবলি) থেকে মুক্ত করে ‘আখলাকে হামিদা’ (প্রশংসিত গুণাবলি) দ্বারা সুসজ্জিত করাকেই তাজকিয়া বলে।
মানুষের দুটি দিক রয়েছে— বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। আরবি ভাষায় যা জাহেরি ও বাতেনি নামে পরিচিত। অভ্যন্তরীণ বা অন্তর পরিশুদ্ধ না হলে বাহ্যিক আমল পূর্ণতা পায় না। তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য অন্তরের বিশুদ্ধতা অর্জন আবশ্যক।
অভ্যন্তরীণ গুণাবলিকে দুভাগে ভাগ করা হয়: আখলাকে হামিদা ও আখলাকে রজিলা। আখলাকে হামিদার পূর্ণতা লাভের প্রথম শর্ত হলো— অন্তর থেকে আখলাকে রজিলা বর্জন করা। প্রধান কয়েকটি আখলাকে রজিলা হলো— হিংসা, অহংকার, লোভ, মিথ্যাচার, গিবত, রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত) ও পরনিন্দা। অপরদিকে আখলাকে হামিদা হলো— আল্লাহভীতি, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা, পরোপকার, সততা, বিনয় ও আমানতদারিতা।
ইমাম গাজালি, ইবনুল কাইয়্যিম ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির (রহ.) মতে, অন্তরের কলুষতা দূরীকরণ ব্যতীত সেখানে প্রশংসিত গুণাবলি স্থান পায় না। বিষয়টি অনেকটা এমন যে, একই পাত্রে মধু ও ময়লা একসঙ্গে শোভা পায় না। আখলাকে রজিলা দূর করে পরিশুদ্ধ অন্তর অর্জনের কয়েকটি পন্থা রয়েছে। প্রথমত একজন সহিহ আকিদার অনুসারী আলেমের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। দ্বিতীয়ত সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর জিকির, বেশি বেশি নফল ইবাদত ও কুরআন তেলাওয়াত করা। সর্বোপরি, আল্লাহর কাছে অসৎ গুণাবলি থেকে মুক্তির জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা।
তাজকিয়ার মূল উদ্দেশ্য— হলো ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর ‘ইহসান’ অর্জন করা। হাদিসে জিবরাইলে ইহসানের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না-ও পাও, তবে বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ, সার্বক্ষণিক আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রেখে নিখুঁতভাবে ইবাদত করাই হলো— ইহসান।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘সেই সফলকাম হয়েছে যে নিজ আত্মাকে পবিত্র করেছে। আর সেই ব্যর্থ হয়েছে যে নিজ আত্মাকে কলুষিত করেছে’ (সুরা শামস : ৯-১০)। এখানে তাজকিয়া বা আত্মার পরিশোধনকে সফলতার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই সফলতার চূড়ান্ত প্রাপ্তি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাতে প্রবেশ। সুতরাং, তাজকিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে তাজকিয়ার অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সমাজে নানা বিভ্রান্তিকর ও ধর্মহীন কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়। সচেতন মুসলিমদের উচিত অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে এসব বিভ্রান্তিকর পথ থেকে দূরে থাকা এবং সঠিক উপায়ে আত্মার পরিশুদ্ধতা অর্জনপূর্বক একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই