সময়ের আলো গ্রাফিকযৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি, যা বহু পরিবারের শান্তি নষ্ট করছে এবং অসংখ্য নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইসলাম মানুষের জানমাল, সম্মান ও অধিকার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ আত্মসাৎ, জুলুম-নির্যাতন এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তবে মোহর ও স্বেচ্ছায় দেওয়া উপহারকে যৌতুকের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। মোহর স্ত্রীর অধিকার; আর এ প্রবন্ধে যৌতুক বলতে বিয়ের শর্তে বা চাপ প্রয়োগ করে অর্থ-সম্পদ দাবি করাকে বোঝানো হয়েছে। কুরআন-হাদিসের আলোকে যৌতুকের ভয়াবহ পরিণতি ও এ থেকে মুক্তির উপায় তুলে ধরা হলো।
অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ গুরুতর গুনাহ : যৌতুকের নামে চাপ সৃষ্টি করে অর্থ বা সম্পদ আদায় করা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)। এ আয়াত মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করতে নিষেধ করে। বিয়ের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কনের পরিবারকে অর্থ দিতে বাধ্য করা, দাবি পূরণ না হলে অপমান করা কিংবা নির্যাতনের ভয় দেখানো ইসলামের ন্যায়নীতির পরিপন্থী। সামাজিক প্রথা বা পারিবারিক মর্যাদার অজুহাতে অন্যায়ভাবে সম্পদ আদায় বৈধ হয়ে যায় না।
জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮)। যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা, তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কিংবা অন্যায়ভাবে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া জুলুমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কোনো নারীকে দুর্বল মনে করে তার ওপর অত্যাচার চালানো ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। দুনিয়ায় ক্ষমতা বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্যায় আড়াল করা গেলেও আল্লাহর বিচারের দিন মানুষের অধিকার নষ্ট করার দায় এড়ানো যাবে না।
স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার নবীজি (সা.)-এর শিক্ষার পরিপন্থী : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। এ হাদিস স্বামীকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সদাচরণের শিক্ষা দেয়। যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা নির্যাতন করা উত্তম চরিত্রের পরিচয় নয়। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের মনে রাখতে হবে, বধূ কোনো পণ্য নন এবং তার পরিবারও সম্পদ আদায়ের মাধ্যম নয়। দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও আল্লাহভীতি।
মোহর স্ত্রীর অধিকার, যৌতুক নয় : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪)। ইসলামে মোহর স্ত্রীর নিজস্ব অধিকার। কিন্তু যৌতুকের নামে কনের পরিবার থেকে নগদ অর্থ, আসবাবপত্র বা অন্য কোনো সম্পদ দাবি করা মোহরের বিধানের সঙ্গে এক নয়। স্বেচ্ছায় উপহার দেওয়া আর সামাজিক চাপ, হুমকি কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে সম্পদ আদায় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো পরিবার উপহার দিতে অক্ষম হলে সে কারণে কনেকে অপমান বা নির্যাতন করা অন্যায়।
নির্যাতন ও হত্যার দায় ভয়াবহ : যৌতুকের দাবিতে কাউকে আঘাত করা, গুরুতর জখম করা কিংবা হত্যা করা হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দায়ও গুরুতর হয়। আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যার পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন (সুরা নিসা, আয়াত : ৯৩)। এ আয়াত ইচ্ছাকৃত হত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে। তবে কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর ঘটনায় অপরাধ ও দায় নির্ধারণে যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন। যৌতুকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা ঘটলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, হত্যার মতো অপরাধের দায় ও শাস্তি নির্ধারণ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয় নয়; এটি যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়।
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮)। অতএব স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের দায়িত্ব হলো যৌতুকের অন্যায় দাবি থেকে বিরত থাকা এবং নির্যাতিত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে নির্যাতন গোপন করা কিংবা ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে বাধ্য করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
যৌতুক কেবল একটি সামাজিক কুপ্রথা নয়; চাপ প্রয়োগ করে সম্পদ আদায়, জুলুম ও নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হলে তা গুরুতর নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধে পরিণত হয়। পবিত্র কুরআন অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে, জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে এবং স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাও পারিবারিক দায়িত্ব ও মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে শরিয়তের নির্দিষ্ট শাস্তি সম্পর্কে কথা বলার সময় অপরাধের ধরন, প্রমাণ ও প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করা জরুরি। যৌতুকের প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের অপরাধ বা একই শাস্তির আওতায় ফেলা যথাযথ নয়। আমাদের কর্তব্য হলো যৌতুকের দাবি ও নির্যাতন বন্ধ করা, অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে