ছবি : সংগৃহীতআরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ইয়েমেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে ইসলামের ইতিহাসেও ইয়েমেনের রয়েছে বিশেষ স্থান। দেশটির মানুষের ঈমান, নরম মন, প্রজ্ঞা আর আমানতদারিতার প্রশংসা করেছেন নবীজি মুহাম্মদ (সা.)। ইয়েমেনের মানুষের জন্য নবী মুহাম্মদ সা. বরকতের দোয়া করেছেন। এমনকি কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসার কূপ থেকে পানি পান করার ক্ষেত্রেও ইয়েমেনবাসীর প্রতি নবীজির বিশেষ অনুগ্রহের কথা বিভিন্ন হাদিসে পাওয়া যায়।
অনেকের মনেই কৌতুহল তৈরি হয়েছে, ইয়েমেনবাসীর প্রতি নবীজি সা. এর এই বিশেষ অনুগ্রহের পেছনের গল্প কী? কারণ কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক রাসুল সা. এর জবানি থেকেই। ইয়েমেনবাসীর প্রশংসা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইয়েমেনের অধিবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তারা মেঘমালার মতো। তারাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাদের অন্তর সবচেয়ে নরম এবং হৃদয় সবচেয়ে কোমল।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৬৭৫৮)
এই বর্ণনায় ইয়েমেনবাসীর ঈমান ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের প্রশংসা ফুটে উঠেছে। মানুষের প্রতি হৃদয়ের কোমলতা, বিনয় ও সহমর্মিতা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। হৃদয়ের এই উদারতা ও কোমলতার জন্যই ইয়েমেনবাসীর প্রশংসা করেছেন নবীজি (সা.)।
তাদের কোমল হৃদয়ের পাশাপাশি প্রজ্ঞা ও ধর্মীয় জ্ঞানের কথাও নানা হাদিসে উঠে এসেছে । আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইয়েমেনবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তারা অত্যন্ত নরম হৃদয়ের অধিকারী এবং তাদের অন্তর খুবই কোমল। ফিকহ আর প্রজ্ঞা দুটিই ইয়েমেনিদের।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩৯০)
এ হাদিসে ইয়েমেনবাসীর দয়া, কোমলতা ও ধর্মীয় জ্ঞানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, সেই জ্ঞানকে প্রজ্ঞার সঙ্গে মিলিয়ে জীবনে ধারণ করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইয়েমেনবাসীর প্রশংসায় নবীজির বলা কথা সেই গুণাবলীরই স্বীকৃতি।
ইয়েমেনের প্রতি বিশেষ অনুরাগ প্রকাশ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমান ইয়েমেনের। সেই সঙ্গে আমিও ইয়েমেনের।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস : ১৬৬২৪)
ইয়েমেনের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর বিশেষ সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায় উপরের বর্ণনা থেকে । এর ব্যাখ্যায় আলেমদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ তার বংশীয় সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইয়েমেনবাসীর ঈমান, স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করতেই তিনি এ কথা বলেছেন।
মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম সুন্দর প্রকাশ মুসাফাহা বা করমর্দন। ইয়েমেনবাসীর সঙ্গে মুসাফাহার প্রসঙ্গেও রয়েছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, একবার ইয়েমেনবাসীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কাছে ইয়েমেনবাসীরা এসেছে। তারাই সর্বপ্রথম মুসাফাহা করেছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২১৩)
এই বর্ণনায় ইয়েমেনবাসীর সঙ্গে মুসাফাহার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্পরিক অভিবাদন ও হৃদ্যতার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়।
ইয়েমেনের প্রতি নবীজি (সা.)-এর অনুরাগের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেশটির জন্য তার বরকতের দোয়া। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আমাদের শাম ও ইয়েমেনে বরকত দান করুন।’
উপস্থিত লোকেরা নজদের জন্যও দোয়া করতে বললে তিনি আবার শাম ও ইয়েমেনের জন্য বরকতের দোয়া করেন। বর্ণনাকারীর ভাষ্যমতে, এরপর তিনি নজদে ভূমিকম্প ও ফিতনা-ফ্যাসাদের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, সেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে। (বুখারি, হাদিস : ১০৩৭)
এ হাদিসে শাম ও ইয়েমেনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বরকতের দোয়া স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তার এই দোয়া ইসলামের ইতিহাসে অঞ্চল দুটির বিশেষ গুরুত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমানতদারিতা। মানুষের অনেক অনেক চারিত্রিক গুণের মধ্যে অন্যতম। বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই গুণের প্রশংসাও এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীতে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি বলেন, ‘রাজত্ব কুরাইশদের মধ্যে, বিচারবিধান আনসারদের মধ্যে, আজান হাবশিদের মধ্যে এবং আমানতদারি আজদ গোত্রের মধ্যে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৯৩৬)
এখানে আজদ গোত্রের আমানতদারিতার প্রশংসা করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে আজদ গোত্রের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে ইয়েমেনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ বর্ণনাও ইয়েমেন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিয়ামতের দিন মুমিন মুসলিমদের জন্য নবীজি (সা.)-এর হাউজে কাউসার কূপ থেকে পানি পান করা হবে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। এ প্রসঙ্গেও ইয়েমেনবাসীর প্রতি নবীজির বিশেষ অনুগ্রহের কথা উঠে এসেছে একটি হাদিসে।
সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আমার হাউজের পাশে থাকব। ইয়েমেনবাসীর জন্য লোকদের সরিয়ে দেব। আমার লাঠি দিয়ে হাউজের পানিতে আঘাত করব, যাতে তা তাদের দিকে প্রবাহিত হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৮৮৪)
এই বর্ণনায় হাউসে কাউসারের পাশে ইয়েমেনবাসীর জন্য জায়গা করে দেওয়ার কথা এসেছে। হাদিসটির ব্যাখ্যায় আলেমরা একে ইয়েমেনবাসীর প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ অনুগ্রহ ও সম্মানের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ইয়েমেনের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুরাগ কেবল একটি ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়, বরং দেশটির মানুষের ঈমান, হৃদয়ের কোমলতা, প্রজ্ঞা ও বিশ্বস্ততারও স্বীকৃতি। তাদের জন্য নবীজির বরকতের দোয়া এবং হাউজে কাউসারের প্রসঙ্গে বিশেষ মর্যাদার উল্লেখ ইসলামের ইতিহাসে ইয়েমেন ও ইয়েমেনবাসীর স্বতন্ত্র অবস্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
সময়ের আলো/এসএকে