গ্রাফিক : সময়ের আলোএকটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের পরিচয় হলো— মানুষ কতটা নিরাপদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা দুর্নীতিমুক্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য কতটা সৎ এবং সমাজে ন্যায়বিচার কতটা প্রতিষ্ঠিত। যে সমাজে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন, খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয়, ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া হয়, মাদক তরুণদের বিপথগামী করে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট হয়, সেখানে শুধু আইন প্রয়োগ করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক জাগরণ, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে ইমাম-খতিব ও আলেম-ওলামাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মসজিদের মিম্বর থেকে উচ্চারিত সত্য, ন্যায়, সততা ও আমানতদারির শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ইমাম-খতিবদের ভূমিকা শুধু খুতবা ও নসিহতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক আচরণে। এ জন্য প্রতিটি মসজিদকে স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী নৈতিক সচেতনতা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
প্রথমত মাসভিত্তিক নৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রতি মাসে জুমার খুতবা ও বয়ানে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে— যেমন ঘুষ ও দুর্নীতি, ব্যবসায় প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল, মাদক, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা সরকারি সম্পদ রক্ষা। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এসব অপরাধের ক্ষতি তুলে ধরার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে তা পরিহারের উপায়ও বোঝাতে হবে। দ্বিতীয়ত স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত পরামর্শসভা করা যেতে পারে। এলাকায় মাদক, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ভোক্তা প্রতারণার মতো কোন সমস্যা বেশি তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ গড়তে হবে। মসজিদকেন্দ্রিক পাঠচক্র, ইসলাম অনুমোদন করে এমন খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত পরামর্শের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। মাদক বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের অপমান না করে তাদের পরিবার, শিক্ষক ও উপযুক্ত পরামর্শদাতাদের সহায়তায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
চতুর্থত ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ শুরু করতে হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজার সমিতি, ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা ও অন্য পেশাজীবীদের নিয়ে সততা ও দায়িত্বশীলতা বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ওজনে কম না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি না করা, ঘুষ বর্জন, কাজে ফাঁকি না দেওয়া এবং জনসম্পদের অপচয় রোধকে সামাজিক অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। পঞ্চমত অভিযোগের সঠিক পথ দেখাতে হবে। কেউ ঘুষ, চাঁদাবাজি, খাদ্যে ভেজাল কিংবা উন্নয়নকাজে অনিয়মের শিকার হলে ইমামরা তাকে প্রমাণ সংরক্ষণ, নিরাপদে অভিযোগ উত্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। তবে নিজেরা তদন্তকারী বা বিচারকের ভূমিকা নেবেন না; গুজব ছড়ানো, প্রকাশ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকবেন। এ ছাড়া মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তা করতে হবে, সেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং ইমামদের প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা করতে হবে।
মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু হওয়া নৈতিক জাগরণ যখন বাজারের সততা, পরিবারের দায়িত্বশীলতা, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতে প্রতিফলিত হবে, তখনই ইমামদের সামাজিক প্রভাব বাস্তব পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হবে। মসজিদের মিম্বরে উচ্চারিত সততার বাণী যেন বাজারে ন্যায্যতা, সরকারি দফতরে স্বচ্ছতা, উন্নয়নকাজে গুণগত মান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতে প্রতিফলিত হয়। এভাবেই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ।
লেখক : সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই