সফলতার দৌড়ে আখেরাত বিসর্জন নয়

মুফতি আতিকুল্লাহ বিন আসাদ

ইসলাম

মানুষ সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে। শৈশব থেকে শুরু হয় ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা, যৌবনে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন, এরপর অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, সামাজিক

2026-10-29T14:58:27+00:00
2026-10-29T14:58:27+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
সফলতার দৌড়ে আখেরাত বিসর্জন নয়
মুফতি আতিকুল্লাহ বিন আসাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষ সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে। শৈশব থেকে শুরু হয় ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা, যৌবনে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন, এরপর অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা অর্জনের নিরন্তর প্রচেষ্টা। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমরা নিজেদের অবস্থানকে আরও সমৃদ্ধ করতে চাই। কিন্তু এই অর্জনের ব্যস্ততায় কখনো কি নিজেকে প্রশ্ন করেছি, দুনিয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুতি এতবেশি অথচ আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি কতটুকু? আজকের পৃথিবীতে সফলতার মাপকাঠি দুনিয়াভিত্তিক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ইসলাম বৈধ উপায়ে উপার্জন, কর্মনিষ্ঠা ও দুনিয়ার কল্যাণ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না। কিন্তু সফলতার দৌড়ে আমরা জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য আখেরাতকে ভুলে যাচ্ছি। অথচ একজন মানুষের প্রকৃত সফলতা তার সততা, নৈতিকতা, আল্লাহভীতি ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধে প্রকাশ পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখেরাতই উত্তম ও অধিক স্থায়ী’ (সুরা আল-আলা : ১৬-১৭)। এই আয়াত আমাদের জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখেরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই সাময়িক প্রাপ্তির মোহে চিরস্থায়ী কল্যাণ বিসর্জন দেওয়া কোনো বিচক্ষণতার পরিচয় হতে পারে না।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় দুনিয়ার দায়িত্ব পালনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার কথা ভুলে যাই। ব্যবসার ব্যস্ততায় নামাজ বিলম্বিত হয়, অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় হালাল-হারামের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে, আর সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চেষ্টায় মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে তাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গঠনে ব্যর্থ হই। প্রকৃত সফলতা হলো দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রাচুর্য থাকলেই প্রশান্তি আসে না; আল্লাহর সন্তুষ্টিই জীবনে প্রকৃত শান্তি এনে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত ধনী সে নয়, যার সম্পদ বেশি; বরং প্রকৃত ধনী হলো অন্তরের ঐশ্বর্যসম্পন্ন ব্যক্তি’ (সহিহ বুখারি : ৬৪৪৬; সহিহ মুসলিম : ১০৫১)। আসলে মুসলিম নর-নারীর সবচেয়ে বড় সফলতা ও সফলতার মানদণ্ড হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার ভয় অর্জন করা এবং রাসুল (সা.)-এর আদর্শে আদর্শবান হওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই প্রকৃত সফলকাম।’ (সুরা নুর : ৫২)

একজন মুমিন ব্যক্তি সফলতা অর্জন করে নামাজের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা নিজদের নামাজে বিনয়াবনত, যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ, যারা জাকাতের ক্ষেত্রে সক্রিয়, যারা নিজদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী; তবে তাদের স্ত্রী ও তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে তারা ছাড়া, নিশ্চয় এতে তারা নিন্দিত হবে না, অতঃপর যারা এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী, আরও যারা নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকারে যত্নবান, যারা নিজেদের নামাজের হেফাজত করে; তারাই হবে ওয়ারিশ, জান্নাতুল ফিরদাউসের ওয়ারিশ, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে’ (সুরা মুমিনুন : ১-১১)। আমাদের উচিত সফলতার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা। এমন শিক্ষা অর্জন করতে হবে, যা জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতাও শেখায়। এমন সম্পদ গড়তে হবে, যা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে অর্জিত নয়। এমন মর্যাদা অর্জন করতে হবে, যা অহংকার নয়, বিনয় বাড়ায়। এমন জীবন গড়তে হবে, যেখানে নিজের উন্নতির পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও মানবতার কল্যাণের চিন্তাও থাকবে।

প্রকৃত সফলতার শুধু পৃথিবীকে জয় করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্রোধের মুহূর্তে সংযত থাকা, লোভের সামনে সততা বজায় রাখা এবং অন্যের সাফল্যে হিংসা না করে তার কল্যাণ কামনা করার মধ্যেও প্রকৃত সফলতা নিহিত। মানুষের মধ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মাৎসর্য এ শক্তিগুলো যখন একজন মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেখানেই আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব, আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও আমাদের মানুষ হতে হয়। অন্য পশুদের কিন্তু তা হতে হয় না। কিন্তু আমাদের মানুষ হয়েও মানুষ হতে হয়, সে জন্যই আমরা মানুষ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করেছে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয়ই জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাজিআত : ৪০-৪১)

আমরা বিশ্বাস করি, পরকালের সফলতাই একজন মুমিনের আসল সফলতা। সেখানেই পাওয়া যাবে অফুরন্ত নেয়ামত। আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সচেতন মুমিন তাই নিজের পরকালটাকেই প্রথমে সাজাতে চায়। সেখানে সফলতায় যারা ধন্য হবে, দুনিয়ার শত কষ্ট নিয়েও তাদের কোনো ভাবনা থাকবে না। দুনিয়ার যত অপ্রাপ্তি, যত ব্যর্থতা, পরকালের সফলতার পর এসব নিয়ে কারও মনেই কোনো আক্ষেপ থাকবে না। মনে রাখতে হবে, একদিন আমাদের অর্জিত সম্পদ, পদমর্যাদা ও পরিচিতি পেছনে পড়ে থাকবে। সঙ্গে থাকবে আমাদের ঈমান, আমল এবং মানুষের সঙ্গে করা আচরণের হিসাব। সেদিন সফল হবেন তিনিই, যিনি দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

আখেরাতের বাস্তবতা খুবই কঠিন। সেখানে হয় আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি থাকবে, নয়তো ভয়াবহ শাস্তি। জাহান্নামের শাস্তির কথা কুরআনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। কেউ যদি এই শাস্তির কথা সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তা হলে সে কখনোই নিজের ইচ্ছায় সেই পথে হাঁটতে চাইবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে এই সত্যকে ভুলে যায়। এই কারণেই কুরআন মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছে, ‘দুনিয়ার জীবন আসলে একটি ধোঁকার সামগ্রী’ (সুরা হাদিদ : ২০)। অতএব সফলতার দৌড় থামানোর প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন দৌড়ের দিক ঠিক করা। এমনভাবে বাঁচতে হবে, যেন দুনিয়ার অর্জন আখেরাতের ক্ষতির কারণ না হয়ে বরং চিরস্থায়ী মুক্তির পাথেয় হয়।

লেখক : খতিব, কামেলিয়া জামে মসজিদ, খিলক্ষেত, ঢাকা

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই
  বিষয়:   আখেরাত 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: