ছবি : সংগৃহীত সমাজে বেশ কিছু প্রচলিত ধারণা আছে, যার মধ্যে একটি হলো, কোরআনের অর্থ না বুঝে পড়লে নাকি সওয়াব পাওয়া যায় না। কিন্তু এই ধারণা কতটুকু সঠিক? কোরআন তিলাওয়াতের জন্য কি এর অর্থ বোঝা বাধ্যতামূলক? না বুঝলে কী হয়? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে?
কোরআনের অর্থ না জেনে, না বুঝে পড়লেও সওয়াব হবে, কিন্তু কোরআনের অর্থ না জানলে পাঠের উদ্দেশ্য অর্জন হয় না। যার ফলে আসল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। বিষটি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, কেউ একজন না বুঝেই কোনো একটি যন্ত্র পরিচালনার নির্দেশিকা পড়ছে।
একটা সময় তো মানুষ কর্মব্যস্ত জীবন পার করে। যার কারণে আসলে সবার পক্ষে মাদরাসায় গিয়ে বা দীর্ঘ সময় দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা শেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমন সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে থাকেন অনেকে।
মনে মনে ভাবতে থাকেন—একা একা কি কোরআনের অর্থ শেখা যায়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, শেখা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতি ও একাগ্রতা। এই দুটি বিষয় থাকলে ঘরে বসেই কোরআনের মর্মার্থ আয়ত্ত করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা ও সুনির্দিষ্ট ধাপ মেনে চলা অপরিহার্য।
১. বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা
যেকোনো ইবাদতের জনই প্রাথমিক কিছু শর্ত থাকে, ঠিক তেমনি কোরআন শেখার কিছু শর্ত আছে। এমধ্যে প্রথম শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। শুধু জ্ঞান জাহির বা বিতর্কে জেতার জন্য নয়, বরং নিজের জীবন বদলানোর জন্য কোরআন অধ্যয়ন শুরু করতে হবে।
কোরআন নিজেই তার পাঠকের জন্য সহজ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, ‘আর আমি তো কোরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি; অতএব কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?’ (সুরা কমার, আয়াত : ১৭)
অধ্যয়ন শুরুর আগে মহান আল্লাহর কাছে কোরআনের জ্ঞান উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।
কোরআনের অর্থ সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য ‘শানে নুজুল’ বা আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট জানা জরুরি; অন্যথায় অনেক আয়াতের খণ্ডিত অর্থ বুঝে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। (শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহ.)
২. নির্ভরযোগ্য অনুবাদ বেছে নিন
নিজে নিজে কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো অনুবাদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে বেঁচে থাকা। এ জন্য শুরুতেই নির্ভরযোগ্য আলেমদের করা প্রামাণ্য ও সহজবোধ্য অনুবাদ বেছে নেওয়া জরুরি। প্রথম পর্যায়ে দীর্ঘ তাফসির বা জটিল ব্যাখ্যাগ্রন্থের পরিবর্তে কোরআনের সরল অনুবাদ পড়ায় মনোযোগ দেওয়া ভালো।
কোনো আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য বুঝতে অসুবিধা হলে সংক্ষিপ্ত তাফসিরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট জানাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি পণ্ডিত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তার ‘আল-ফাওজুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির’ গ্রন্থে কোরআনের অর্থ অনুধাবনে ‘শানে নুজুল’ বা আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট জানার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা না থাকলে অনেক আয়াতের আংশিক অর্থ বুঝে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। (দেহলভি, ‘আল-ফাওজুল কাবির ফি উসুলিত তাফসির’, পৃষ্ঠা ৪৫, দারুল বাশাইর, দামেস্ক, ১৯৯৬)
৩. কোরআনের আরবি শব্দের অর্থ জানুন
কোরআনের বক্তব্য আরও গভীরভাবে বুঝতে আরবি শব্দের অর্থ শেখা সহায়ক হতে পারে। কোরআনে বেশ কিছু শব্দ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। এসব বহুল ব্যবহৃত শব্দের অর্থ জানা থাকলে অনুবাদ বুঝতে সুবিধা হয় এবং আয়াতের বক্তব্য অনুধাবন করাও সহজ হয়।
ভাষাবিদ আল-রাগেব ইস্ফাহানি কোরআনের শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ বোঝার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ‘আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন- গ্রন্থে কোরআনের শব্দাবলির অর্থ জানার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। (আল-ইস্ফাহানি, ‘আল-মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন’, পৃষ্ঠা ১২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)
৪. নিজের মতো করে আয়াতের ব্যাখ্যা করবেন না
একাকী কোরআন অধ্যয়নের সময় নিজের ধারণা অনুযায়ী আয়াতের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো থেকে বিরত থাকা জরুরি। কোনো আয়াতের অর্থ নিয়ে সংশয় তৈরি হলে অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই কোরআনের ব্যাখ্যা করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৯৫০)
অর্থাৎ, একা কোরআন পড়ার মানে এই নয় যে এর প্রতিটি আয়াতের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য নিজে নিজেই নির্ধারণ করতে হবে। বরং যেখানে প্রয়োজন, সেখানে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী আলেমদের সহায়তা নেওয়া উচিত।
৫. নিয়মিত ও পরিমিতভাবে পড়ুন
কোরআন শেখা দীর্ঘ সময়ের সাধনা। তাই অল্প সময়ে অনেক আয়াত পড়ার চেয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক আয়াতের অর্থ বুঝে পড়া বেশি কার্যকর হতে পারে। শুরুতে প্রতিদিন পাঁচ থেকে দশটি আয়াত পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৫)
নিয়মিত অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে তুলতে ফজর বা এশার নামাজের পরের মতো একটি নির্দিষ্ট সময় বেছে নেওয়া যেতে পারে। এতে প্রতিদিন কোরআন পড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।
বর্তমানে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য অ্যাপ, অডিও ও ভিডিও লেকচারের মাধ্যমেও ঘরে বসে কোরআনের অর্থ শেখার সুযোগ রয়েছে। এসব উপকরণ অধ্যয়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, একা একা কোরআন পড়া মূলত প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন ও ব্যক্তিগত অনুশীলনের একটি উপায়। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ইসলামি সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞতা থাকা জরুরি। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যোগ্য আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
সময়ের আলো/এসএকে