গ্রাফিক : সময়ের আলোশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো একটি শিশুর মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা বিকাশের পবিত্রতম স্থান। যেখানে বাবা-মায়ের পর শিক্ষকরা হন শিশুদের পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ মানুষ গড়ার দক্ষ কারিগর। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে বিভিন্ন বিদ্যালয় ও মাদরাসার মতো ধর্মীয় বিদ্যাপীঠে কোমলমতি শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের মতো জঘন্য ও পাশবিক অপরাধের খবর প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে উঠে আসছে, যা আমাদের বিবেককে চরমভাবে দংশন করছে। যে হাত পরম স্নেহে খাতা-কলম ধরিয়ে শিশুকে আলোর পথ দেখানোর কথা, সেই হাত যখন লালসার বশবর্তী হয়ে অবুঝ শিশুর শরীর ও মনকে ক্ষতবিক্ষত করে, তখন সমাজ ও মানবতার আর কোনো গৌরব অবশিষ্ট থাকে না। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয় বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও ইনসাফভিত্তিক জীবনবিধান, যা প্রতিটি শিশুর পূর্ণ নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছে। এই সামাজিক ব্যাধি ও চরম নৈতিক অবক্ষয়ের গ্রাস থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইসলামের শাশ্বত ও মানবিক নির্দেশনার কাছে।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে শিশুদের সমাজের সবচেয়ে নিষ্কলুষ, নিষ্পাপ এবং মহান আল্লাহর দেওয়া বিশেষ আমানত বা জান্নাতের ফুল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের প্রতি অন্তহীন স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শনকে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঈমানের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ এবং জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পবিত্র বাণী অনুযায়ী, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। ইসলামের এই সুষ্পষ্ট মূল নীতিটি প্রমাণ করে যে, শিশুদের কোনোভাবেই অবহেলা, নিষ্ঠুরতা বা কোনো প্রকার লাঞ্ছনার পাত্র বানানো যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন, মদিনার রাস্তাঘাটে শিশুদের দেখলে নিজে আগে সালাম দিতেন, আনাস (রা.)-এর মতো শিশু সাহাবিকে দীর্ঘ দশ বছর পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে উম্মতকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
অথচ আজ একশ্রেণির কুচক্রী ও বিপথগামী মানুষ শিক্ষকের পবিত্র লেবাস গায়ে জড়িয়ে এই স্বর্গীয় নিয়তের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং একটি ক্ষমার অযোগ্য জঘন্যতম অপরাধ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন একজন শিক্ষক কর্তৃক কোনো শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তা কেবল একটি দৈহিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এটি একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক জগৎকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম মানুষের শারীরিক ও মানসিক— উভয় প্রকার সুরক্ষার ব্যাপারে সমান গুরুত্বারোপ করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বনি আদম বা মানবজাতিকে সর্বোত্তম সম্মানে ভূষিত করার কথা ঘোষণা করে বলেছেন, আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। যখন কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোনো শিশুর এই পবিত্রতা হরণ করে, তখন সে মূলত আল্লাহর দেওয়া সেই সর্বজনীন মানবিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত হানে। একজন শিশুর মানসিক সুস্থতা ও আত্মসম্মান বজায় রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরি, কারণ ইসলামে মানুষের ইজ্জত বা সম্মান রক্ষা করাকে শরিয়তের অন্যতম প্রধান লক্ষ বা ‘মাকাসিদ আশ-শরিয়াহ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে প্রিয় নবী (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র ও হারাম করা হলো, যা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
ইসলামের বিচার ব্যবস্থায় ব্যভিচার, ধর্ষণ এবং যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নকে সবচেয়ে গুরুতর, হীন ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় এটি একটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল চূড়ান্ত অপরাধের জন্যই নয় বরং অপরাধের দিকে ধাবিত করে এমন প্রতিটি কুদৃষ্টি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, অসৎ উদ্দেশ্যমূলক অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণকেও ইসলাম ‘চোখের জিনা’ বা ‘হাতের জিনা’ হিসেবে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে, যারা নিজেদের রক্ষা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং যারা শিক্ষকদের পরম বিশ্বাসে ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণামূলক ও পাশবিক আচরণ ইসলামের দৃষ্টিতে ‘খেয়ানত’ বা আমানতের চরম লঙ্ঘন। শিক্ষকতার আসনটি একটি পবিত্র আমানত, আর পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তারা সফল মুমিন।
অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার মধ্যে প্রকৃত ঈমান নেই।
পবিত্র ইসলামে শিক্ষকতাকে অত্যন্ত সম্মানিত এবং একটি গুরুদায়িত্বপূর্ণ ‘রাঈ’ বা অভিভাবকত্ব হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। বুখারি শরিফের সুপরিচিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানের জন্য দায়বদ্ধ নন বরং তার কাছে পড়তে আসা প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার ওপর অর্পিত দ্বীনি কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে একজন পরম করুণাময় শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরম মমতা, ধৈর্য ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, কখনো কোনো শিশুর মনে ভয় বা ক্ষোভের জন্ম দেননি। কোনো শিক্ষক যখন সেই মহান আদর্শ ভুলে লালসার বশবর্তী হয়ে শিশুর ক্ষতি করে, তখন সে দুনিয়ার আইনের পাশাপাশি পরকালে আল্লাহর দরবারেও চরম জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে।
ভয়াবহ এই সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামি মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা ও নৈতিক শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেবল তাদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাই নয় বরং তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা, তাকওয়া ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষালয়গুলোকে এমন একটি নিরাপদ দুর্গে রূপান্তর করতে হবে যেখানে প্রতিটি শিশু কোনো প্রকার ভয় ও নির্যাতনের শিকার না হয়ে তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। সমাজের আলেম-ওলামা, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকেও এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা ইসলাম সমর্থন করে না। আসুন পবিত্র ইসলামের সুমহান ও ইনসাফভিত্তিক শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভালোবাসাময় পৃথিবী গড়ে তুলি, কারণ আজকের সুরক্ষিত ও সুস্থ শিশুই আগামী দিনের একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন আদর্শ সমাজের কারিগর।