ছবি : সংগৃহীত বিয়ে আমাদেরকে একটি বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। কবুল বলার মাধ্যমে একজন নারী আর পুরুষে মধ্যে একটি হালাল সম্পর্ক তৈরি হয়। যে সম্পর্কে তাদের নাম হয় স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী নতুন একটি পরিবারে যুক্ত হোন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ ও নতুন সম্পর্কের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় তাকে শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, রান্নাবান্না এবং ঘরের নানা কাজের দায়িত্বও নিতে হয়। আমাদের সমাজে এসব কাজকে অনেক ক্ষেত্রে পুত্রবধূর দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা তার জন্য পালন করা আবশ্যক মনে করা হয়। এ নিয়ে পরিবারে তৈরি হয় নানা ধরনের ভুল বোঝাবুঝি ও মনোমালিন্য। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা কি পুত্রবধূর জন্য বাধ্যতামূলক? এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে? চলুন বিষয়টি জেনে নেই।
পরিবারকে ভালোবাসা, সম্মান, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ রাখার শিক্ষা দেয় ইসলাম। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও এর থেকে ভিন্ন নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বামীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর ও সম্মানজনক আচরণ করা স্বামীর দায়িত্ব। তার অনুভূতি, মতামত ও সামর্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। সংসার পরিচালনায় একে অপরের সহযোগী হওয়া এবং পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই দাম্পত্য জীবনে সুখময় হয়। সংসারে নেমে আসে শান্তির ফাল্গুধারা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদ মুসলিমদের মধ্যে ইমানের দিক দিয়ে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর এবং যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে সবচেয়ে বেশি উত্তম।’ (তিরমিজি : ২৬১২)
এই হাদিসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তাই দাম্পত্য জীবনে শুধু নিজের অধিকার আদায়ের চিন্তা না করে একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি।
শরিয়তের দৃষ্টিতে পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব নয়। উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউনের দারুল ইফতা থেকে দেওয়া এক ফতোয়াতেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পুত্রবধূকে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করতে বাধ্য করা শরিয়তের বিধান নয়। (ফতোয়া নং : ১৪৪৫১১১০২০৯৬)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, পুত্রবধূ তাদের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ করবেন। বরং স্বামীর মা-বাবাকে সম্মান করা, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা উত্তম কাজ। নিজের মা-বাবার মতো তাদের পাশে দাঁড়াতে পারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থেকে করা কাজকে জোর করে চাপিয়ে দিলে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়। সেবা না করার কারণে পুত্রবধূকে অপমান করা কিংবা মানসিক চাপে রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
শ্বশুর-শাশুড়ির ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় দেখাশোনার মূল দায়িত্ব তাদের সন্তানের, বিশেষ করে ছেলের। তাই নিজের মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে ছেলেকেই এগিয়ে আসতে হবে। স্ত্রীকে দিয়ে সব দায়িত্ব পালন করিয়ে নিজে দায়মুক্ত থাকার সুযোগ নেই। স্বামী চাইলে স্ত্রীর সহযোগিতা নিতে পারেন, তবে তা হতে হবে তার সম্মতি ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে। পারিবারিক রীতি বা সামাজিক প্রত্যাশার দোহাই দিয়ে স্ত্রীর ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
একইভাবে শ্বশুর-শাশুড়িরও উচিত পুত্রবধূকে পরিবারের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা। তাকে শুধু সংসারের কাজ করার মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ ও সম্মান দেওয়া প্রয়োজন। তার পছন্দ-অপছন্দ, ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে সময় দিতে হবে এবং ভুলত্রুটি হলে সহনশীল আচরণ করতে হবে।
একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলার দায়িত্ব কোনো একজন মানুষের নয়। স্বামীকে নিজের মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে, পুত্রবধূকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্মান করতে হবে এবং শ্বশুর-শাশুড়িকেও তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। কাউকে বাধ্য করে দায়িত্ব পালন করানোর চেয়ে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামের শিক্ষা হলো, পরিবারে প্রত্যেকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তাই শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা পুত্রবধূর জন্য বাধ্যতামূলক না হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো উত্তম চরিত্র ও মানবিকতার পরিচয়। একই সঙ্গে তাদেরও পুত্রবধূর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখানো উচিত। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং সহযোগিতাই একটি পরিবারে স্থায়ী শান্তি ও সুখ এনে দিতে পারে।
সময়ের আলো/এসএকে