প্রকাশ: রোববার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ৩৯০০)
এক সময় লালচে-খয়েরি রঙে কেবল যৌন উত্তেজক নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা বাজারজাত হতো। এখন সেই একটিমাত্র রঙে আর সীমাবদ্ধ নেই।
লাল, কালো, নীল, গোলাপি এমনকি সাদা রঙেও ইয়াবা তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এত রঙ পাল্টানোর কারণ মূলত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া। রঙ পাল্টে অন্য জীবন রক্ষাকারী কোনো ট্যাবলেট বা ওষুধ হিসেবে যাতে মনে করা হয় সেই লক্ষ্যেই প্রতিনিয়ত ইয়াবা ট্যাবলেটের রঙ পাল্টাচ্ছে মাদক কারবারিরা।
সম্প্রতি বিভিন্ন ইয়াবার চালান আটক এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে খয়েরি, লাল ও নীল রঙের ইয়াবা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চোরাইভাবে বাজারজাত হচ্ছে। এসব ইয়াবার রয়েছে চমকপ্রদ ছদ্মনাম। নেশাখোর বা পেশাদার ক্রেতা ও বিক্রেতারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বাধাবিপত্তি ছাড়াই ইয়াবার কারবার চালাতে এসব ছদ্মনাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এক সময় ইয়াবাকে বাবা, চম্পা, সুন্দরী ইত্যাদি ছদ্মনামে ডেকে কারবার চালানো হলেও সেসব নামও এখন পাল্টে গেছে। কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ইয়াবাকে ‘বোতাম’ বলা হচ্ছে। এ ছাড়া বেশি মূল্যের ইয়াবাকে ‘বড়ভাই’ এবং কম মূল্যের ইয়াবাকে ‘ছোটভাই’ বলা হচ্ছে। এর বাইরেও আরও কিছু সাংকেতিক নাম বা শব্দ ব্যবহার করে ইয়াবার কারবার চালানো হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, ইয়াবার মূলঘাঁটি বা কারখানা মিয়ানমারে। ওপারের সীমান্ত থেকে নাফ নদী হয়ে ইয়াবা আসছে কক্সবাজারের টেকনাফে। সেখান থেকে কিছু ছোট ছোট চালান সড়কপথে এবং বড় ধরনের ইয়াবার চালান সমুদ্র ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন উপক‚লীয় অঞ্চলের নৌপথে ছড়িয়ে যায় সারা দেশে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সময়ের আলোকে বলেন, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়তই কৌশল পাল্টাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ইয়াবার রঙ পাল্টানো হচ্ছে। এ ছাড়া ছদ্মনাম ব্যবহারসহ বহনকারী বা ‘কেরিয়ার’-এর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে র্যাবের গোয়েন্দারা সব সময়ই নজরদারি বা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। মাদক তথা ইয়াবার ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে এলিট ফোর্স র্যাব।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন সময়ের আলোকে মোবাইল ফোনে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই ইয়াবা ট্যাবলেটের রঙ পাল্টানো হচ্ছে। সাধারণত যে রঙের ইয়াবা বেশি ধরা পড়েছে এখন তা অন্য রঙে পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে খয়েরি ও নীল রঙের ইয়াবার প্রচলন বেশি বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইকবাল হোসেন বলেন, সম্প্রতি সাদা রঙের ইয়াবার একটি চালানও আটক করা হয়। যা দেখতে প্রথমেই মনে হবে কোনো রোগের প্রচলিত ওষুধ বা ট্যাবলেটের মতো। অন্যদিকে আরও একটি লালচে রঙের ইয়াবার চালান আটক করা হয়। তবে এই লালচে ইয়াবা হাতে নিয়ে সামান্য ঘঁষা দিতেই ভেতরে সাদা রঙ লক্ষ্য করা যায়। পরে দেখা যায়, এই ট্যাবলেটগুলো নকল ইয়াবা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মুজিবুর রহমান পাটোয়ারী সময়ের আলোকে মোবাইল ফোনে বলেন, ইয়াবার প্রায় সব চালানই আসছে মিয়ানমার থেকে। ইয়াবা বন্ধে শুরু থেকেই মিয়ানমারের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু ইয়াবা বন্ধেই মিয়ানমারের সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। প্রথম মিটিংয়ে যৌথ সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৈঠকের যৌথ সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেনি মিয়ানমার। যেহেতু মিয়ানমার থেকে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না, তাই দেশের অভ্যন্তরেই কঠোরতা বাড়াতে হবে। অবশ্য ডিএনসি, র্যাব, পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই কঠোরতা দেখিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবার বিস্তাররোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই। তবে আরও বেশি ভ‚মিকা পালন করতে হবে সীমান্তের দায়িত্বে নিযুক্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি)। মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় যথাযথভাবে টহলের ব্যবস্থা করতে হবে।