ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯, ১২:০০ এএম
রমজান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ মাস। এ মাসে কোরআনুল কারিম নাজিল হওয়ার কারণে এ মাসের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মাস যে পাবে, তার ওপর রোজা পালন করা ফরজ। আর প্রত্যেক রোজাদারের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার। তা ছাড়া রাসুল (সা.)-এর হাদিসে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল কিন্তু তার গুনাহসমূহকে মাফ করে নিতে পারল না, তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। সুতরাং এ মাসে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে সব বিধানগুলো পালনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সফলতার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিন-মুসলিমের জন্য জরুরি। ইতোমধ্যে রমজানের অর্ধেকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। বাকি দিনগুলোকে সফল করতে কিছু আমলের কথা উল্লেখ করছি।
নিয়ত শুদ্ধ করা
ইসলামে প্রত্যেক ভালো কাজের গ্রহণযোগ্যতা এবং তার ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার পাওয়া নির্ভর করে নিয়তের ওপর। সুতরাং কেউ যদি রমজান থেকে সত্যিকারের সফলতা লাভ করতে চায় তাহলে তার প্রাথমিক কাজ হবে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা। প্রত্যেক ইবাদত হবে শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষমা, করুণা এবং খুশি প্রত্যাশা করা।
নিজেকে ইবাদতে সম্পৃক্ত রাখা
ইবাদতের ব্যাপারে আমাদের একটা ভুল ধারণা হলো, শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, জাকাত কিংবা মসজিদের ভেতরে কৃত কাজগুলো ইত্যাদিকে ইবাদত মনে করি। এটি ঠিক নয়। বরং একজন মুসলিমের প্রত্যেকটি কাজ যদি তা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী হয় তাহলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপÑ আমরা আমাদের চাকরি কিংবা ব্যবসাকে তুলে ধরতে পারি। তা যদি শরীয় বিধান অনুযায়ী হয় তাহলে তাও ইবাদত। অর্থাৎ প্রত্যেকটা কাজ হালাল ও হারাম হিসেব করে সম্পাদন করাও ইবাদত।
কোরআন তেলাওয়াত করা ও এর অর্থ-ব্যাখ্যা
বোঝার চেষ্টা করা
কোরআন সমগ্র জাতির হেদায়েত তথা সঠিক পথ দেখানোর জন্য নাজিল হয়েছে। সুতরাং তা শুধু তেলাওয়াত নয় বরং বোঝার চেষ্টা করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরি। আমাদের সমাজে রমজান মাসে অনেকেই কোরআন খতম অর্থাৎ সম্পূর্ণ কোরআন তেলওয়াত করে থাকেন। এটি ভালো কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে তার বাণী বোঝার চেষ্টা করতে হবে। রমজান কোরআন নাজিলের মাস হওয়ায় এটিকে আমরা কাজে লাগাতে পারি।
বেশি বেশি জিকির করা
জিকির সম্পর্কে আমাদের একটা ভুল ধারণা হলো তসবিহ কিংবা হাতের আঙুলের কর গুনে আল্লাহ ও তার সুন্দর নামগুলো কিংবা কলেমা পাঠ করাকে বুঝে থাকি। অথচ জিকিরের অনেকগুলো পন্থার মধ্যে এটি একটি। সবচেয়ে কার্যকর জিকির হলো, প্রত্যেকটা কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহকে এভাবে স্মরণ রাখা যে এগুলো তাঁর দেওয়া বিধান অনুযায়ী হচ্ছে কি না কিংবা এটির কারণে আমাকে তার সামনে লজ্জিত হতে হবে কি না এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হবে কি না।
মসজিদে বেশি বেশি সময় ব্যয় করা
এ দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো মসজিদ। রমজান মাসে আমাদের অফিসের সময় কম থাকে। সুতরাং বাকি সময়ের সর্বোচ্চটুকু মসজিদে থাকার চেষ্টা করা। কারণ, এখানে অন্যায় কাজ করার সুযোগ যেমন কম থাকে তেমনি দুনিয়াবি অনেক বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়। তদুপরি, রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফে থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত প্রত্যেক মুসলিমের। এ সময়ের যেকোনো এক বিজোড় রাত্রিতে আছে লাইলাতুল কদর যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (সুরা কদর : ১)। ইতেকাফের মাধ্যমে সে রাত পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সাহরি ও ইফতারে অন্যদের সম্পৃক্ত করা
রমজানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সাহরি ও ইফতার। ইফতার ও সাহরিতে অন্যদেরকে সম্পৃক্ত করে এক সঙ্গে সম্পাদন করার মধ্যে অনেক কল্যাণ রয়েছে। বিশেষ করে কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায় যোগ হবে কিন্তু রোজাদারের কোনো কমতি হবে না। এভাবে আমরা আমাদের সওয়াবকে বহুগুণে বাড়িয়ে নিতে পারি এ মাসে।
রাগ ও জবান নিয়ন্ত্রণ করা
মানবীয় খারাপ গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো রাগ। রাগের সময় মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ফলে ওই ব্যক্তির পক্ষে যেকোনো কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠে। তা ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সদাচারণ করার পাশাপাশি আমাদের জিহবাকে এমন সব কথা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি যাতে অন্যরা কষ্ট না পায়। কারণ, এর মাধ্যমে ওই ব্যক্তির ভালো আমলগুলো নষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলিম হলো ওই ব্যক্তি যার কথা ও কাজ থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি: হাদিস নং ৯)। তবু যদি কেউ রোজাদারের সঙ্গে ঝগড়া করতেও চায় তাহলে বলতে হবে, ‘আমি রোজাদার’। (বুখারি : ১৯০৪)
ক্ষমা করা
ক্ষমা করা মহৎ গুণ। আল্লাহ ও তার রাসুলেরও সুন্নত হলো এটি। ক্ষমার মাধ্যমে অন্যের কাছ থেকে দোয়া ও কল্যাণ পাওয়া সম্ভব হয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ। তোমাদের কোনো কোনো স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। যদি মার্জনা কর, উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।’ (সুরা তাগাবুন : ১৪)
বেশি বেশি সদকা দেওয়া
বলা হয়ে থাকে, রমজান মাস সদকার মাস। এ মাসে বেশি বেশি সদকা করা উচিত। সদকার প্রতিদান আল্লাহ অবশ্যই দিয়ে থাকেন। তা ছাড়া এটির মধ্য দিয়ে সমাজে যেমন অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয় তেমনি সম্প্রতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি হয়। ফলে একে অপরের কল্যাণকামী হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি উত্তম রিজিকদাতা।’ (সুরা সাবা : ৩৯)। যারা ধনী নয়, যারা অর্থ কিংবা কোনো কিছু কাউকে দান করার সামর্থ্য রাখে না তারাও কিন্তু সদকা করতে পারেন। মানুষের ভালো ব্যবহারও সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের জন্য তোমার হাসিটাও সদকা। পথের মাঝ হতে কোনো পাথর, কাটা কিংবা হাড় (যা কষ্টদায়ক হয় পথচারীর জন্য) সরানোটাও সদকা। বিপথগামী মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়াটাও সদকা।’ (আবু দাউদ : হাদিস নং ১৯৮০)
তওবা এবং দোয়া
আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন। কোনো মানুষ যদি পাহাড় পরিমাণও অন্যায় করে খাঁটি তওবা করে তাহলে তাকেও মাফ করে দেওয়া হয়। তওবা করার উত্তম উপায় হলো, পাপের কথা স্মরণ করে আল্লাহর নিকট লজ্জিত হওয়া, ভবিষ্যতে আর করব না এ ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া। কোরআন ঘোষণা করছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর আন্তরিক তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কাজসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম : ৮)
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক