পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা

আলী হাসান তৈয়ব

ইসলামের আলো

ইসলামে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় নানাবিধ বিষয় শেখানো হয়েছে। কোরআন ও সুন্নায় পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আরও ব্যাপক শব্দ ‘তাহারাহ’ তথা পবিত্রতা

2019-09-05T00:00:00+00:00
2019-09-05T00:34:05+00:00
 
  শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা
আলী হাসান তৈয়ব
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম  আপডেট: ০৫.০৯.২০১৯ ১২:৩৪ এএম  (ভিজিট : ৭১৮)
ইসলামে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় নানাবিধ বিষয় শেখানো হয়েছে। কোরআন ও সুন্নায় পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আরও ব্যাপক শব্দ ‘তাহারাহ’ তথা পবিত্রতা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ‘তাহারাহ’ শব্দ যেমন কুফরী ও বিধার্মিকতা থেকে নিয়ে যাবতীয় পাপাচারের মতো অভ্যন্তরীণ নোংরামি থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে, তেমনি তা সব রকমের বাহ্যিক অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। বাহ্যিক পবিত্রতা একজন মুমিনের সালাত শুদ্ধ হওয়ার পূর্বশর্ত। যেমন ‘হাদছ’ তথা অবস্তুগত অপরিচ্ছন্নতা থেকে পবিত্র হতে হয় অজু বা গোসল দ্বারা তেমনি ‘খুবুছ’ তথা বস্তুগত অপরিচ্ছন্নতা থেকেও পবিত্র হতে হয় দেহ, বস্ত্র ও স্থান পরিষ্কারের মাধ্যমে। এ কারণেই ইসলামে ফিকহ শাস্ত্রের সব গ্রন্থে প্রথমেই ‘কিতাবুত-তাহারাত’ তথা পবিত্রতা অধ্যায় স্থান পেয়েছে। কেননা সালাতে প্রবেশের জন্য এটি অবিকল্প পথ। তাই জান্নাতের চাবি যেমন সালাত, তেমনি সালাতের চাবি পবিত্রতা।

ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার ওপর, প্রথম দিন থেকে তা বেশি হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা তাওবা : ১০৮)। আবু মালেক আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম : ২২৩)

পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বের পরিধি ইসলামে যেভাবে বিস্তৃত অন্য কোনো ধর্মে এমনটি কল্পনাও করা যায় না। ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা, গৃহের পরিচ্ছন্নতা ও পরিপার্শে^র পরিচ্ছন্নতা কোনোটাই বাদ যায়নি। ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় অন্তত জুমাবারে গোসলের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো হাদিসে এ ক্ষেত্রে ‘ওয়াজিব’ শব্দও উল্লিখিত হয়েছে। যেমন আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন গোসল করা প্রতিটি সাবালক ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব।’ (বুখারি : ৪৭৯)। আরেক হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর জন্য প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য হলো (অন্তত) প্রতি সাত দিনের মাথায় তার মাথা ও শরীর ধৌত করা।’ (বুখারি : ৮৯৭; মুসলিম : ৮৪৯)

ইসলামে চুলের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমাদের বাসায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বেড়াতে এলেন। এখানে এসে তিনি এক এলোকেশী ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। তার সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এ ব্যক্তি কি এমন কিছু জোটাতে পারেনি যা দিয়ে সে তার মাথার চুল বিন্যস্ত করবে।’ আরেকজনকে তিনি দেখলেন ময়লা বস্ত্র পরিহিত। তার উদ্দেশে বললেন, ‘এ ব্যক্তি কি এমন কিছু জোগাড় করতে পারেনি যা দিয়ে সে তার কাপড় পরিষ্কার করবে।’ (মুসনাদ আহমাদ : ১৪৮৫০; বাইহাকি : ৫৮১৩)

আর এর পূর্ণতা হিসেবে উল্লেখ করা যায় ‘সুনানে ফিতরাত’ তথা প্রকৃতির সুন্নত খ্যাত বিষয়গুলো। এসব থেকে স্পষ্টই ধারণা মেলে যে, মানুষের পরিচ্ছতা ও সৌন্দর্য এবং সুস্থতা ও কমনীয়তার নেয়ামত রক্ষায় শরীয়তে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাদ যায়নি নখ কাটা, গোঁফ ছোট করা, বোগলের চুল উপড়ানো থেকে নিয়ে গুপ্তাঙ্গের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা পর্যন্ত কোনোটাই। বুখারি ও মুসলিম শরিফে এ সম্পর্কিত অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন মা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত গোঁফ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধৌত করা, বগলের নিচের চুল তুলে ফেলা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, (বাথরুমের প্রয়োজন পূরণের পর) পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। বর্ণনাকারী বলেন, দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি, যদি না তা হয় ‘কুলি করা’। (মুসলিম : ২৭৫৭)

ব্যক্তির পর গৃহ পরিচ্ছন্ন রাখতেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাদিসে। নিজের শরীর ও পোশাকের মতো আবাসস্থানকেও নোংরা, আবর্জনা ও দৃষ্টিকটু উপাদান থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিজের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা রক্ষায় এর বিকল্প নেই। ইমাম তিরমিজি একটি হাদিস সংকলন করেছেন। হজরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রকে পছন্দ করেন; আল্লাহ পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন; আল্লাহ মহৎ, তিনি মহত্ত¡ পছন্দ করেন; আল্লাহ বদান্য, তিনি বদান্যতা পছন্দ করেন। অতএব তোমরা তোমাদের (ঘরের) উঠানগুলো পরিচ্ছন্ন রাখবে।’ (তিরমিজি : ২৭৯৯)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা লানতকারী (অভিশাপের কারণ) দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাক। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, লানতকারী (অভিশাপের কারণ) দুটি কাজ কী? তিনি বললেন, ‘যে মানুষের চলাচলের রাস্তায় কিংবা তাদের ছায়ায় পেশাব-পায়খানা করে।’ (আবু দাঊদ : ২৫; মুসনাদ আহমদ: ৮৮৫৩)

খাদ্য ও পানীয়কে দূষণমুক্ত রাখতে পাত্র ঢেকে রাখাসহ বিভিন্ন জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেমন, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমরা বাসন ঢেকে রাখ, পানপাত্রের মুখ বন্ধ রাখ, দরজা অর্গলাবদ্ধ কর এবং এশার সময় তোমাদের শিশুদের সামনে রাখ। কেননা এ সময় জিনরা ছড়িয়ে পড়ে এবং আছর করে। আর তোমরা নিদ্রাকালে বাতিগুলো (প্রদীপসমূহ) নিভিয়ে দিও। কেননা ইঁদুর কখনও প্রদীপের সলতে টেনে নিয়ে যায়। অতঃপর তা গৃহবাসীকে জ্বালিয়ে দেয়।’ (বুখারি : ৩৩১৬)

লেখক : খতিব ও প্রাবন্ধিক



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: