প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ৯৩০)
মানুষের জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে। স্বামীর আগে স্ত্রী মারা যায় আবার স্ত্রীর আগেও স্বামী মারা যায়। এখানে কারও মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমাদের সমাজে কোনো পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে ওই পুরুষের জন্য পরিবার ও সমাজের লোকদের অনুতাপ-ভাবনার সীমা থাকে না। মাস না ঘুরতেই তাকে বিয়ে করাতে উঠেপড়ে লেগে যায়। কিন্তু কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে অনেকেই তাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে দিতে চায় না। নারী নিজ থেকে বিয়ের ইচ্ছে পোষণ করলে তাকে দেখা হয় বাঁকা চোখে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর জন্য তাকেই দায়ী করা হয়। এমনকি তাকে ‘অপয়া’, ‘অলক্ষ্মী’ ইত্যাদি মনে করা হয়। এভাবে বিধবা নারীরা সমাজে ভীষণভাবে অবহেলিত। তারা সমাজের মানুষের ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বিভিন্ন কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ। এর কারণে বিধবা নারী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতে পারে না। অথচ তাদের দ্বিতীয় বিয়ে ইসলামে অনুমোদিত।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) ছাড়া অন্য সব স্ত্রী ছিলেন বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার থেকে প্রায় অর্ধেক বয়স বেশি ৪০ বছর বয়স্কা বিধবা নারী হজরত খাদিজাকে (রা.) সর্বপ্রথম বিয়ে করেন। খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ক্রমান্বয়ে দশজন নারীকে বিয়ে করেন, যাদের আটজনই ছিলেন বিধবা। তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসার, মানবিক কারণ, বিশেষ করে তৎকালীন আরবের কুসংস্কার উচ্ছেদ করে বিধবাদের অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য এসব বিয়ে করেছিলেন।
ইসলাম বিধবা নারীদের অনেক অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করবে, তাদের স্ত্রীদের কর্তব্য হলো চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এরপর যখন ইদ্দত (চার মাস দশ দিন) পূর্ণ করে নেবে, তখন তারা নিজেদের ব্যাপারে বিধিমতো ব্যবস্থা নিলে তাতে কোনো পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত আছেন।’ (সুরা বাকারা : ২৩৪) এখানে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদেরকে ইদ্দত পালনের চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বাকি জীবন কীভাবে কাটাবেন সে ব্যাপারে সেই নারীরা বিধানমতো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। ইচ্ছা করলে তারা দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারবে এবং অন্য পুরুষরাও তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারবে। স্বামীর মৃত্যুর পর তারা এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। স্বেচ্ছায় অন্যত্র যেতে না চাইলে শ^শুরবাড়ির লোকজন যেন তাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে না দেন সে নির্দেশও পবিত্র কোরআনে দেওয়া হয়েছে।
বিয়ের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত মোহরানা, স্বামীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং পিতার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত যে সম্পদ নারীরা পান, তা একান্তই তাদের। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! নারীদেরকে জোরপূর্বক উত্তরাধিকারের পণ্য হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয় এবং তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কোনো অংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্য তাদেরকে আটকে রেখো না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর, এমনকি তোমরা যদি তাদেরকে পছন্দ নাও কর। এমনও তো হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ কর, তাতেই আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (সুরা নিসা : ১৯)
অনেক নারী আছেন, যারা বিধবা হওয়ার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে আগ্রহী হন না। কষ্ট হলেও একাকী জীবনযাপনের পথই বেছে নেন। হাদিস শরিফে তাদের জন্য সান্ত¦না ও আখেরাতের সুসংবাদ জানানো হয়েছে। হজরত আউফ বিন মালিক আশজায়ি (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি এবং কষ্ট ও মেহনতের কারণে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মহিলা কেয়ামতের দিন দুই আঙুলের মতো কাছাকাছি থাকব। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তর্জনী ও মধ্যমা পাশাপাশি করে দেখালেন। বংশীয় কৌলিন্য ও সৌন্দর্যের অধিকারিণী যে বিধবা নারী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এতিম সন্তানদের লালন-পালনের উদ্দেশে দ্বিতীয়বার স্বামী গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে।’ (আবু দাউদ : হাদিস ৫১৪৯) তা ছাড়া যে বিধবাদের বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে এবং তাদের কোনো সন্তানও নেই। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক পুণ্যের কাজ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবার
কর্তৃক তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা মোটেই উচিত নয়। বরং পরিবারের অন্য সবার মতো তাদের সঙ্গেও সদ্ভাব ও সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং অন্য দশজন মুসলিম নারীর মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্যই উৎসাহিত করা হয়েছে। কোনো বিধবাকে সারা জীবন অবিবাহিত অবস্থায় একাকী জীবন কাটানোর কোনোরূপ বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম