গণপূর্তে জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

রফিকুল ইসলাম সবুজ

প্রথম পাতা

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শামীমকে কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জোন ঢাকা মেট্রোপলিটন ও ঢাকা

2019-09-29T00:00:00+00:00
2019-09-29T00:59:53+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রথম পাতা
গণপূর্তে জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৯.০৯.২০১৯ ১২:৫৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শামীমকে কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জোন ঢাকা মেট্রোপলিটন ও ঢাকা জোনের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে’কে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেনসহ অন্তত ১৫ প্রকৌশলী। তাদের এখনও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়নি। তবে ওএসডি হওয়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপলের বিরুদ্ধে কানাডা ও ভারতে টাকা পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি হালিম নামে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে মোটা অঙ্কের অর্থের  বিনিময়ে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি করার অভিযোগ পেয়েছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ঠিকাদার জিকে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর আসল চেহারা বেরিয়ে আসছে গণপূর্তের কয়েকজন প্রকৌশলীর। এরই মধ্যে ওএসডি হওয়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের ব্যাংক হিসাব তলব করা হলেও শামীমের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া অন্য প্রকৌশলীদের এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তবে অন্তত ১৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে গোয়েন্দারা। প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে’র ছেলে কানাডায় বসবাস করার কারণে সেখানে টাকা পাচার করা হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি উৎপল দে তার ছেলেকে কয়েক কোটি মূল্যের গাড়ি কিনে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের রড-সিমেন্ট দেওয়ায় নির্মাণের সময়ই ভেঙে পড়ে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাচীর। ওই সময় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন এই উৎপল দে। পরে এ ঘটনার তদন্ত করে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তাতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেও ধামাচাপা পড়ে যায় তদন্ত প্রতিবেদন।

অন্যদিকে ঢাকার দুটি জোনের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল দে ২৪ সেপ্টেম্বর ওএসডি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই জোনে দুজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি কাউকেই দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। এমনকি জিকে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তিনি অধিদফতরে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরও করছেন না। তবে উৎপল কুমার দে দাবি করেছেন অন্য একজনকে দায়িত্বে বসানোর জন্য অন্যায়ভাবে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার আহ্বানের সময় দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম। তিনি অধিদফতরটির প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তাকে কৌশলে গণপূর্ত ঢাকা জোনে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য মো. সাহাদাত হোসেন এ ষড়যন্ত্র করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয় গত বছরের জুন মাসে। তখন টেন্ডার নিষ্পত্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও বিশেষ প্রকল্প-পিএনএসপি) ড. মঈনুল ইসলাম।

প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, প্রকল্পের দরপত্র গণপূর্ত ঢাকা সার্কেল-৩ থেকে আহ্বান ও তৎকালীন ঢাকা গণপূর্ত জোন থেকে মূল্যায়ন করার কথা। র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার গণপূর্ত ঢাকা সার্কেল-৩-এর অধীনে। কিন্তু নিয়ম-নীতি না মেনে গণপূর্ত অধিদফতর (সদর দফতর) থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু ড. মঈনুল ইসলামও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধেও জিকে শামীমের দেওয়া ঘুষ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাকে মেধাক্রম লঙ্ঘন করে প্রধান প্রকৌশলী পদে বসাতে জিকে শামীম কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছিলেন বলে তখন কথা উঠেছিল। বিদায়ি গণপূর্তমন্ত্রী তার শেষ কার্যদিবসে ৭ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে সাহাদাত হোসেনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের নিয়ে যখন শপথ গ্রহণে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তড়িঘড়ি করে সাহাদাতকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ সাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ কর্মরত থাকা অবস্থায় কাজের প্রাক্কলন ও অর্থ বরাদ্দ প্রাপ্তি ছাড়াই কমিশনের জন্য নিয়ম বহির্ভূতভাবে দরপত্র আহ্বান করায় তখন তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। নোয়াখালীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় জমি সংক্রান্ত দুর্নীতির দায়ে দুদকের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তারপরও জিকে শামীমের প্রভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তাকে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়।

সম্প্রতি গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৮-এ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হালিমকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার সহপাঠীরা পূর্তমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, হালিম বিআইটি, রাজশাহীতে ছাত্র শিবিরের রাজনীতি করতেন এবং ছাত্র সংসদে শিবির মনোনীত শরীরচর্চা সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার বদলি হয়েছেন। প্রথমে আমান উল্লাহ নামে একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকা এবং জিকে সিন্ডিকেটের সহযোগী হিসেবে পরিচিত আমান প্রধান প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিলেও বিতর্ক শুরুর পরে তাকে ঢাকার বাইরে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই বদলি বাণিজ্য নিয়ে খোদ পূর্তমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

উৎপল কুমার দে ছাড়াও জিকে শামীমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে আছেন সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শঙ্কর কুমার মালো, ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন, ঢাকা নগর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত উল্লাহসহ অন্তত ১৫ প্রকৌশলী।

এ সিন্ডিকেট সদস্যরা মিলেই ঠিকাদারি কাজের পাশাপাশি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া ও অসাধু কর্মকর্তাদের ঘুপচি টেন্ডার অনুমোদনসহ সব ধরনের কাজ করে আসছিলেন। পঙ্গু হাসপাতালের আধুনিক ভবন নির্মাণ, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ভবন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, নিউরো সাইন্স, বিজ্ঞান জাদুঘরসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প জিকে শামীমের জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (জি কে বিল্ডার্স) করেছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে ইজিপি এড়িয়ে ওটিএম’র মাধ্যমে প্রকল্পের টেন্ডার শুরু করে এ সিন্ডিকেট। তবে প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। অধিদফতরে কোনো সিন্ডিকেট নেই।

যুবলীগ নেতা পরিচয়ে প্রভাবশালী ঠিকাদার জিকে শামীমকে সরকারি ভবন নির্মাণের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেছেন যে প্রক্রিয়ায় শামীম ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন, সেটা নিয়মের অধীন ছিল নাকি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা হয়েছিল তা আমরা খতিয়ে দেখছি।

বিষয়টি তদন্তাধীন, তদন্তেই সব তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।


Loading...
Loading...
প্রথম পাতা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: