
*সালাম না দিলে পেটানো হতো শিক্ষার্থীদের
*ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেই মারধর
*পিটিয়ে লবণ মেখে দেওয়া হতো
বুয়েট যেন ছাত্রলীগের বাপ-দাদার ক্যাম্পাস। নিজের মতোই রাজত্ব করে তারা। যাকে ইচ্ছে পেটায়, যাকে ইচ্ছে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়। আবার কাউকে পিটিয়ে আঘাতের স্থানে লবণও মাখিয়েও দেয় ছাত্রলীগের নির্যাতনকারী নেতারা। এসব অসহ্য নির্যাতন সহ্য করে মুখ বুজে অনেকে থাকলেও কেউ কেউ শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলেও গেছেন।
ভুক্তভোগী ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। মিছিলে না যাওয়া, সালাম না দেওয়া, হল ফেস্টের টাকা না দেওয়া ও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে এসব নির্যাতন চালানো হয়। ছাত্রদের নির্যাতনের বিষয়ে বুয়েটের প্রতিটি হলের প্রভোস্টরা জানতেন কিন্তু তারা ছিলেন ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে অসহায়। যা প্রকাশও করেছেন আবরার হত্যার এক দিন পর। বুয়েটের এক শিক্ষক বলেন, আমাদের চেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাদের ক্ষমতা অনেক বেশি।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যার শিকার হওয়ার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা নির্যাতনের কথা। কেউ এসব বিষয়ে মুখও খুলছেন। কেউ আবার নির্যাতনের কথা ফেসবুকেও জানান দিচ্ছেন। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা একটি ওয়েব পেজ খুলেছিলেন। তাতে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়া ছাত্ররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।
২০১৬ সালের শেষদিকে বুয়েটের সিএসই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ওয়ানস্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম (ইউ রিপোর্টার) নামে একটি সার্ভার গড়ে তোলেন। এতে বুয়েটের যেকোনো শিক্ষার্থী নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ জানাতে পারেন। বুধবার পর্যন্ত ১০৩টি অভিযোগ সার্ভারে জমা হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার রাতে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর বেশ কিছু নতুন অভিযোগ জমা পড়েছে। শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনকে জানানো হলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে ওয়েব পেজটি হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেছে।জানা গেছে, সেটি বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থার চেয়াারম্যান মো. জহুরুল হক বৃহস্পতিবার এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে বুয়েট শিক্ষার্থীরা আবারও একটি পেজ খুলেছেন সেখানে আবারও নানা অভিযোগ জমা পড়ছে বলে জানা গেছে।
বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান মোস্তফা আকবর জানান, বিটিআরসির পেজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে যে পরিমাণ অভিযোগ জমা পড়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ কাজ করতে পারে।
পেজ বন্ধ করে দেওয়াকে ন্যক্কারজনক বলছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, ছাত্রলীগের দোষ ঢাকতেই এমনটি করা হয়েছে। যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলো ধামাচাপা দিতেই এটি করা হয়েছে।
কিছু কক্ষ ছিল টর্চার সেল : বুয়েটের নজরুল ইসলাম হল, সোহরাওয়ার্দী হল, আহসানউল্লাহ হল, শেরে বাংলা হল, তিতুমীর হল ও রশিদ হলে ছাত্রদের পেটানোর জন্য ছাত্রলীগের ছেলেরা একেকটি কক্ষকে টর্চার সেলে পরিণত করে। আর এসব তথ্য বিভিন্ন ছাত্রের অভিযোগে উঠে এসেছে।
নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা জানান, সোহরাওয়ার্দী হলের ১১২ ও ৩০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়মিত ছাত্রদের পেটানো হতো। শুধু মানসিক নয়, শারীরিক ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করা হতো। ভদ্র বানানোর পদ্ধতিতে সারা রাত দাঁড় করিয়ে শাস্তি দিয়ে পড়াশোনা ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো হতো। তারা মাঝে মাঝে হল থেকে বের করে দেওয়ারও হুমকি দিত। প্রতিটি বিভাগের ছাত্রদের ডাকা হতো তাদের সহপাঠীদের নামের তালিকা মুখস্থ বলার জন্য। আর এসব করত ছাত্রলীগের ছেলেরা।
আরেক ছাত্র অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ দাপট দেখানো শুরু করে। তুচ্ছ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ইন্ধনে ব্যাচ-৭-এর একটি ছেলেকে নজরুল ইসলাম হল থেকে ১ সেমিস্টারের জন্য হলে না থাকার নির্দেশ দেয় ব্যাচ-৪-এর ছাত্রলীগের ছেলেরা। বিষয়টি প্রভোস্টকে জানানোর কারণে ব্যাচ-৭-এর ছেলেদের হল ক্যান্টিনে ডেকে ওই হলের ছাত্রলীগ সভাপতি তালাশের (ব্যাচ ৩) নেতৃত্বে মারধর করা হয়।
তিতুমীর হলের ১৮তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী জানান, হলে ওঠার পর থেকেই নিয়মিত তাদের টর্চার করা হতো। থাপ্পড় মারা, ক্লাসমেটকে দিয়ে আরেক ক্লাসমেটকে মারানো, অসংখ্যবার কানধরে উঠবস করতে করতে তারা হাঁটতেও পারতেন না। একবার একটি মিছিলে না যাওয়ার কারণে ১৭তম ব্যাচের ছাত্রলীগের নেতারা তাদের ছাদে ডেকে ব্যাপক মারধর করে। বিশেষ করে ওইদিন যারা টিউশনিতে ছিলেন তাদের বেশি পেটানো হয়। বিষয়টি লজ্জায় তারা কাউকে জানাতেও পারেননি।
সালাম না দিলেও চলত চড় থাপ্পড় মারধর : বুয়েটের ১৬তম ব্যাচের এক ছাত্র পেজটিতে অভিযোগ করেন, তিনি হল ও বাসা মিলেই থাকতেন। একদিন আসিফ জামাল অর্ক (কেমিক্যাল ১৫ ব্যাচ) তাকে সোহরাওয়ার্দী হলের পকেট গেটের সামনে পেয়ে পথ আটকায় এবং তাকে সজোরে কয়েকটি থাপ্পড় মারে। থাপ্পড় মারার কারণ জানতে চাইলে তাকে জানানো হয়, সেই বড়ভাইটিকে তিনি সালাম দেননি বলে তার এমন কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হলো।
পিটিয়ে রক্তাক্ত মুখে লবণ মাখিয়ে দেয় ছাত্রলীগ নেতা : এক ছাত্র পেজটিতে অভিযোগে বলেন, টিউশনি করে নজরুল হলে ফিরছিলাম। আউলার গেটে ঢুকতেই শুনতে পারি গগনবিদারী কান্না। ঢুকতেই দেখি ইউকসুর সামনে কেউ পড়ে আছেন। পরে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি বুয়েট ছাত্রলীগের এক নেতা শুভ্র জ্যোতিকে মাটিতে ফেলে তার মুখমন্ডলে লাথি মারছে। তারপর কোত্থেকে একটা মোটা বাটাম নিয়ে এসে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে পেটাতে লাগল শুভ্রকে। তার ক্যান্টিন থেকে একজন লবণ এনে দিল ৭-এর তন্ময়ের হাতে। এরপর সেই ছেলেটিকে তুলে তার রক্তাক্ত মুখে লবণ মাখিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসে দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি এসব কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে বলে জানা গেছে।
নির্যাতনে অনেকে বুয়েট ছেড়েছে : এক ছাত্র পেজে অভিযোগ করেছেন, সিএসইআই বিভাগের এক ছেলের ফেসবুকের সূত্র ধরে তাকে সোহরাওয়ার্দী হলে সারা রাত পিটিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতারা। ওই ছাত্রের পিঠে কামড়ের দাগ ছিল। এ ঘটনার নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগের হাসান সারোয়ার সৈকত (মেকা-১৫) নামের এক ছাত্র। পরবর্তী সময়ে নির্যাতিত ছেলেটি দ্বিতীয় দফায় একটি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে বুয়েট ছেড়ে চলে যান।
চলতি মাসেও শেরে বাংলা হলে একজনকে মারধর করা হয় : গত ৩ অক্টোবর রাতে শেরে বাংলা হলের ২০২ নং কক্ষে এহতেশাম নামে এক ছাত্রকে বেধড়ক পেটায় একই হলের ছাত্রলীগের কর্মী (পুলিশের হাতে গ্রেফতার) ইফতি মোশাররফ সকাল (বিএমই-১৬), আশিকুল ইসলাম বিটু (কেমিক্যাল-১৬), মুজতবা রাফিদ (কেমিক্যাল-১৬) সহ ৪ জন। মারধরের পর তারা ওই ছাত্রকে এককাপড়ে বের হয়ে যেতে বলে। পরবর্তী সময়ে তাকে তারা হল থেকে বের করেও দেয়। কিন্তু কাপড়, জিনিসপত্র ও ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার কম্পিউটারটিও ফেরত দেওয়া হয়নি। এসব জিনিসপত্র ছাত্রলীগের ছেলেরা নিয়ে যায়। বিষয়টি সেদিন হলের সহকারী প্রভোস্ট শাহিনকে জানানো হলেও তিনি কোনো প্রকার সহযোগিতা করেননি।
হল প্রভোস্টরা নির্যাতনের খবর জেনেও ছিলেন নিশ্চুপ : ছাত্ররা জানান, তাদের ওপর নির্যাতনের কথা তারা প্রতিটি হলের প্রভোস্টকে জানালেও কোনো কাজ হতো না। উল্টো তাদের ওপরে নানাভাবে চাপ আসত। হল প্রভোস্টরা বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ধরনের কথাও বলতে চাইতেন না। এমনকি নির্যাতন থামানো বা প্রতিরোধের কোনো ধরনের ব্যবস্থাও নেননি তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্র কল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমার দায়িত্ব পালনকালে তিন মাসে তিনটি অভিযোগ এসেছে। অভিযুক্তদের এক বছরের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করে শাস্তিও দেওয়া হয়। এ ছাড়াও উপযুক্ত শাস্তির জন্য ঊর্ধ্বতনকে বিষয়গুলো জানানো হয়।