হাশরের মাঠে যা কিছু প্রথম

ইসলামের আলো

পরজগতের প্রথম ধাপ কবর। কবরের পর হাশর। হাশরের মাঠে পৃথিবীর সব মানুষ একত্র হবে। সুদীর্ঘকাল মানুষ সেখানে অবস্থান করবে। মূলত

2019-12-26T00:00:00+00:00
2019-12-26T00:00:00+00:00
 
  বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬,
২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
ইসলামের আলো
হাশরের মাঠে যা কিছু প্রথম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম 
পরজগতের প্রথম ধাপ কবর। কবরের পর হাশর। হাশরের মাঠে পৃথিবীর সব মানুষ একত্র হবে। সুদীর্ঘকাল মানুষ
সেখানে অবস্থান করবে। মূলত মানুষের চূড়ান্ত বিচার হবে হাশরে। সুবিশাল হাশরের মাঠে যা কিছু প্রথম সংঘটিত
হবেÑ সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন আরিফ খান সাদ
সর্বপ্রথম জাগ্রত ব্যক্তি
পৃথিবীর মহাপ্রলয় সংগঠিত হওয়ার বহু সময় পর আল্লাহ তায়ালার আদেশে ইসরাফিল (আ.) দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। তখন কবরগুলো বিদীর্ণ হয়ে সব মানুষ জেগে উঠবে এবং হাশরের মাঠে সমবেত হবে। সর্বপ্রথম আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কবর থেকে উঠবেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার পর সর্বপ্রথম আমি মাথা তুলব। তখন আমি দেখব, হজরত মুসা (আ.) আরশের এক পায়া ধরে আছেন। আমি জানব না, তিনি এভাবেই ছিলেন নাকি দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার পর সেখানে গিয়েছেন।’
(বুখারি : ৪৮১৩)
সর্বপ্রথম কাপড় পরিধানকারী
মানুষ যখন কবর থেকে উঠবে তখন শরীরে কোনো পোশাক, জুতা বা টুপি কিছুই থাকবে না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের হাশরের ময়দানে খালি পা, বিবস্ত্র এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। এরপর তিনি পবিত্র কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেনÑ ‘যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম তেমনিভাবে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করব, এটা আমার প্রতিশ্রুতি, এর বাস্তবায়ন আমি করবই।’ (সুরা আম্বিয়া : ১০৪)। অতঃপর সেদিন সর্বপ্রথম যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহিম (আ.)।’ (বুখারি : ৩১১২)। মানুষের শরীরের কোনো কাপড় না থাকলে একে অন্যের দিকে দৃষ্টি পড়তে পারে এবং লজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; আয়েশা (রা.) নবীজিকে এ কথা বললে নবীজি বললেনÑ ‘সেদিনের ভয়াবহতা এত গুরুতর হবে যে, কেউ কারও দিকে তাকানোর কল্পনাও করতে পারবে না। সবাইকে আপন আপন অবস্থা ব্যস্ত করে রাখবে।’ (বুখারি : ৬৫২৭; মুসলিম : ২১৯৪)। হজরত ইবরাহিমকে (আ.) সর্বপ্রথম কাপড় পরিধানের সম্মান দেওয়ার কারণ হচ্ছেÑ ইরাকের বাবেল শহরের অত্যাচারী বাদশাহ নমরুদ তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। আগুনে নিক্ষেপের সময় তার পরিধেয় বস্ত্র খুলে নেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর দ্বীনের জন্য তিনিই প্রথম বস্ত্রহরণের অপমান সহ্য করেছিলেন। তাই তার জন্য বস্ত্রপরিধানের এ সম্মান। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ১০/২৫২)
সর্বপ্রথম সম্বোধিত ব্যক্তি
হাশরের ময়দানে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে এবং পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ শেষে জান্নাতে ও জাহান্নামে প্রেরণ করা হবে। সে ভয়াবহ দিনে যাকে সর্বপ্রথম সম্বোধন করা হবে তিনি মানবজাতির প্রথম সদস্য হজরত আদম (আ.)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম আদমকে (আ.) ডাকা হবে। তিনি তার বংশধরকে দেখতে পাবেন। তখন সবাইকে বলা হবে, ইনি হচ্ছেন তোমাদের পিতা আদম। জবাবে সবাই বলবে হাজির! হাজির! আমরা আপনাকে দেখতে হাজির! এরপর তাকে আল্লাহ বলবেন, তোমার বংশধর থেকে জাহান্নামিদের বের কর। তখন আদম (আ.) বলবেন, হে আমার রব! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ বলবেন, প্রতি একশ থেকে নিরানব্বই জনকে বের কর। নবীজির মুখে এ কথা শুনে সাহাবিরা বলে উঠলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! প্রতি একশ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের মাঝে অবশিষ্ট থাকবে কী? নবীজি বললেন, নিশ্চয় অন্য সব উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মত হচ্ছে কালো ষাঁড়ের গায়ের সাদা পশমের মতো।’ (বুখারি : ৬০৮৫)
সর্বপ্রথম হিসাব হবে যাদের
সেদিন হিসেবের জন্য তিন ব্যক্তিকে প্রথমে উপস্থিত করা হবে। সর্বপ্রথম একজন শহীদকে উপস্থিত করা হবে। তার নিয়ত ও আমলের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। যদি তাতে ইখলাস থাকে তবে উত্তম ফয়সালা হবে। অন্যথায় পরিণাম হবে খুব মন্দ। তারপর আলেমকে উপস্থিত করা হবে এবং নিয়ত ও আমলের প্রকার বিচার করা হবে। যদি তাতে ইখলাস থাকে তবে উত্তম ফয়সালা হবে। অন্যথায় পরিণাম হবে খুব মন্দ। অতঃপর দানশীল ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে এবং নিয়ত ও আমলের ধরন দেখা হবে। যদি তাতে ইখলাস থাকে তবে উত্তম ফয়সালা হবে। অন্যথায় পরিণাম হবে খুব মন্দ। এভাবে অন্য শ্রেণির লোকদের উপস্থিত করা হবে। (মুসলিম : ৪৭৭০)
সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসিত বিষয়
পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত ভোগ সম্পর্কে বান্দাকে সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসা করা হবে। সুস্থতা, ফলমূল ভক্ষণ, সুপেয় পানি পান, গাছের শীতল ছায়া ও ঘুমের তৃপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দা যেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে তার ভেতর সর্বপ্রথম হচ্ছে পৃথিবীতে উপভোগকৃত নেয়ামতসমূহ। বান্দাকে সেদিন বলা হবেÑ আমি কি তোমাকে সুস্থ সবল শরীর দান করিনি? আমি কি তোমাকে শীতল সুপেয় পানি পান করাইনি?’ (তিরমিজি : ৩৩৫৮)
সর্বপ্রথম হিসাবের বিষয়
পৃথিবীতে মানুষের আমলের গ্রহণযোগ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। যেসব আমল করার কথা ছিলÑ কিন্তু করেনিÑ সেসব নিয়েও জিজ্ঞাসা করা হবে। হাশরের মাঠে সর্বপ্রথম নামাজের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় হাশরের মাঠে বান্দার যে আমলের হিসাব সর্বপ্রথম নেওয়া হবেÑ তা হচ্ছে তার নামাজ। সুতরাং যদি কারও নামাজ সঠিক হয়, তবে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি নামাজের হিসাবে ত্রুটি পাওয়া যায়, তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অবশ্য যদি তার ফরজ ইবাদতে কিছু ঘাটতি থাকে, তাহলে আল্লাহ বলবেন, দেখ আমার বান্দার কিছু নফল ইবাদত আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করে দেওয়া হবে? অতঃপর এভাবে অন্য সব ইবাদতের হিসাব নেওয়া হবে।’ (আবু দাউদ : ৮৬৪; তিরমিজি : ৪১৩; ইবনে মাজা : ১৪২৫)
সর্বপ্রথম ফয়সালার বিষয়
হাশরের মাঠে সর্বপ্রথম রক্তপাতের ফয়সালা হবে। পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে কেউ কাউকে হত্যা করলে তার ফয়সালা দ্রুত হয়ে যাবে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হাশরের ময়দানে বিচারের দিন মানুষের মাঝে সর্বপ্রথম রক্তপাতের (হত্যার) ফয়সালা প্রদান করা হবে। (বুখারি : ৪৮৬৪; মুসলিম : ১৬৭৮)
সর্বপ্রথম যে বিষয়ের নিষ্পত্তি
হাশরের মাঠে সর্বপ্রথম দুই প্রতিবেশীর ঝগড়ার মামলা নিষ্পত্তি হবে। হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিচারের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহর আদালতে যে মামলার বিচার হবে, তা হলো দুই প্রতিবেশীর ঝগড়ার মামলা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৭২; আল-মুজামুল কাবির লিতাবরানি : ১৪২৫২; সহিহুল জামে : ২৫৬৩)। আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, একটি হাদিসে এসেছে, ‘হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে,’ অন্য হাদিসে এসেছে, ‘হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম বান্দার রক্তপাতের ফয়সালা হবে,’ আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম দুই প্রতিবেশীর অমীমাংসিত বিষয়ের নিষ্পত্তি হবে’Ñ হাদিস তিনটির ভেতর বাহ্যিক দৃষ্টিতে বৈপরীত্য মনে হলেও আসলে কোনো বৈপরীত্য নেই। কেননা ‘হুকুকুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ও বান্দার হক সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব হবে। যেহেতু ‘হুকুকুল্লাহ’-র অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহের ভেতর সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে নামাজ। আর ‘হুককুল ইবাদ’ অর্থাৎ বান্দার সঙ্গে বান্দার হক সম্পৃক্ত বিষয়ের ভেতর প্রতিবেশীর হক ও অধিকার অগ্রগণ্য, তাই এর মীমাংসা আগে হবে। আর কিছু বিষয় আছে একই সঙ্গে ‘হুকুকুল্লাহ ও হুককুল ইবাদ’ অর্থাৎ আল্লাহর হকের সঙ্গে যেমন সম্পৃক্ত তেমনি বান্দার হকের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এটা একই সঙ্গে পাপ এবং অপরাধ। বান্দার সঙ্গে বান্দার ও আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পাপ ও অপরাধ হচ্ছে রক্তপাত ঘটানো। তাই এর ফয়সালা আগে হবে। অতএব বর্ণনা তিনটির ভেতর কোনো বৈপরীত্য নেই। (মিরকাতুল মাফাতিহ : ১০/২৫৮)

হাশরের মাঠের আরও আলোচনা
পড়ুন আগামী বৃহস্পতিবার

Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: