
বিশ্ব দরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করেন যারা পবিত্র কোরআনে হাফেজ ও কারীরা তাদের অন্যতম। বাংলাদেশি তারকা হাফেজরা প্রায়ই সুমধুর তেলাওয়াত ও হৃদয়কাড়া সুরে নজর কাড়ছেন বিশ্ববাসীর। তাদের অনন্য অবদানে বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনাম হয় ১৭ কোটি মানুষের সোনার বাংলাদেশ। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হিফজুল কোরআন ও কেরাত প্রতিযোগিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত হাফেজদের নিয়ে লিখেছেন আমিন ইকবাল ও জুনায়েদ হাবীব
হাফেজ নাজমুস সাকিব
২০১২ সালে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় ২৭টি দেশের হাফেজদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ নাজমুস সাকিব। পরে ২০১৩ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় ৮৬টি দেশের সঙ্গে লড়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৪ সালে অর্জন করেন পবিত্র মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার। এ ছাড়াও ২০১৫ সালে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতা ও সুদানের রাজধানী খার্তুমে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা মহাদেশ কেরাত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন কোরআনের এই তারকা। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইতাইল পল্লীতে। ২০০১ সালের ২৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মো. আবুল কালাম আজাদ। মা সালমা বেগম।
হাফেজ সাআদ সুরাইল
২০১২ সালে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় (১০ পারা গ্রুপে) প্রথম স্থান অধিকার করেন হাফেজ সাআদ সুরাইল। প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মক্কার গভর্নর খালেদ আল ফয়সাল। প্রধান বক্তা ছিলেন পবিত্র হারাম শরিফের ইমাম শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইস। সে সময় বিজয়ীদের হাতে সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট ও নগদ অর্থ তুলে দেন সৌদি আরবের ধর্মমন্ত্রী সালেহ বিন আবদুল আজিজ বিন আশ শায়েখ। হাফেজ সাআদ সুরাইলের গ্রামের বাড়ি নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে। ২০০০ সালে কারী মাওলানা আবদুল জলিল ও রহিমা আক্তার জেসমিনের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।
হাফেজ মোহাম্মদ তানভির
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হাফেজ মোহাম্মদ তানভির ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত বাদশা আবদুল আজিজ আল সৌদ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় (৩০ পারা গ্রুপে) প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রায় ৭৩টি দেশের প্রতিদ্ব›দ্বী হাফেজদের মধ্যে সেরা নির্বাচিত হয়ে দেশকে বিশ্বদরবারে অনেক উঁচুতে তুলে ধরেন প্রতিভাবান এ তরুণ। এ ছাড়াও হাফেজ তানভির ২০১৬ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত (৩৩তম) তেহরান আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের গ্রুপে বিচারক প্যানেলে তার সুরেলাকণ্ঠী তেলওয়াতের মাধ্যমে বেশ সুনাম অর্জন করেন। হাফেজ মোহাম্মদ তানভির ঢাকার যাত্রাবাড়ী মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেছেন।
হাফেজা ফারিহা তাসনিম
খুদে হাফেজা ফারিহা তাসনিম ২০১৩ সালের ১৭ মে জর্দানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল গার্লস হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশের হাফেজাদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জর্ডানের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী ড. মোহাম্মদ নূহসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও দেশটির শীর্ষ আলেমরা। অনুষ্ঠানে বিশ্বজয়ী হাফেজাদের হাতে সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট ও নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়।
হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন
২০১৪ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন। ২০১৫ সালে মিসরের রাজধানী কায়রোতে ৫৫টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ২৪তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায়ও প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। তা ছাড়া ২০১৬ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২০তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় এবং ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর সৌদি আরবের বাদশা আব্দুল আজিজ আল সৌদ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিশে^র ৮১টি দেশের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ মামুন। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় তার জন্ম। বাবার নাম আবুল বাশার, মাতা আমেনা বেগম। হাফেজ মামুন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর তাহফিজুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসায় হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করেন।
হাফেজ মুহাম্মদ হেলাল উদ্দীন
২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর সৌদি আরবে বাদশা আব্দুল আজিজ আল সৌদ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন হাফেজ মুহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মক্কার গভর্নর খালেদ আল ফয়সাল। আরও উপস্থিত ছিলেন পবিত্র হারাম শরীফের ইমাম শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইস। জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট ও নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়।
হাফেজ হেলালের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায়। বাবার নাম হাফেজ মাওলানা মো. মঈনুদ্দীন, মা আলেমা মারুফা হোসাইন। তিনি হিফজ সম্পন্ন করেন ঢাকার মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায়।
হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া
২০১৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ১৯তম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৮০টি দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া। ২০১৬ সালে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কেরাত ও হিফজ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তা ছাড়া ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি সুদানে অনুষ্ঠিত অষ্টম খার্তুম ইন্টারন্যাশনাল কোরআন অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় তাহফিজ ও তাফসির উভয় বিভাগে বিশ্বের প্রায় ৭৫টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া। তিনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার চর ইসলামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম হাফেজ মাওলানা ফয়জুল্লাহ, মা মোসাম্মৎ জাহানারা বেগম। তিনি হিফজ সম্পন্ন করেন ঢাকার তাহফিজুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসায়।
হাফেজ সাইফুর রহমান ত্বকি
হাফেজ সাইফুর রহমান ত্বকি ২০১৫ সালে জেদ্দায় আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৬ সালে বাহরাইনে তৃতীয় স্থান ও ২০১৭ সালে কুয়েত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৫ জুন জর্ডানের রাজধানীর আম্মানে অনুষ্ঠিত ২৭তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিশ্বের প্রায় ৬২টি দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে লড়াই করে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ঢাকা যাত্রাবাড়ীর মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলেন হাফেজ ত্বকি।
হাফেজা রাফিয়া হাসান জিনাত
হাফেজা রাফিয়া হাসান জিনাত ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘ফাতেমা বিনতে মোবারক’ আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় ৮৩টি দেশের মধ্যে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে নবম স্থান অর্জন করেন। দুবাইয়ের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ক্লাবের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে মোবারক। তা ছাড়া ২০১৬ সালে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে নারী হাফেজদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
হাফেজা রাফিয়া হাসানের জন্ম পটুয়াখালীর বাউফল ইউনিয়নে। বাবার নামা মাওলানা নাজমুল হাসান ও মা জাকিয়াতুন নেসা। ২০০১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। যাত্রাবাড়ীর মাদ্রাসা মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনালে হিফজুল কোরআন রপ্ত করেন তিনি।
হাফেজ ইয়াকুব হোসাইন তাজ
হাফেজ ইয়াকুব হোসাইন তাজ ২০১৭ সালে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল জিম টিভির কেরাত ও হিফজ রিয়েলিটি শোতে অংশ নিয়ে ২৮টি দেশের প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এর আগে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় ৯৬টি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে অংশ নিয়ে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। হাফেজ ইয়াকুব ঢাকার তানযীমুল উম্মাহ হিফজ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে। বাবার নাম মো. হোসাইন।
হাফেজ তরিকুল ইসলাম
হাফেজ তরিকুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১৫ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই) অনুষ্ঠিত ২১তম হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১০৩টি দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হাফেজদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তার হাতে সম্মাননা ও সার্টিফেট প্রদান করেন দেশটির যুবরাজ আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন আল মাকতুম। হাফেজ তরিকুল ইসলাম হিফজুল কোরআন সম্পন্ন করেন মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদ্রাসায়। তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মালিগাঁও গ্রামের মো. আবু বকর সিদ্দিক ও তহুরা বেগম দম্পতির সন্তান।
হাফেজ মুহাম্মদ শিহাব উল্লাহ
সর্বশেষ ২০১৯ সালে ৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের খুদে হাফেজ মুহাম্মদ শিহাব উল্লাহ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ১০৩টি দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে এ গৌরব অর্জন করেন তিনি। সৌদি বাদশাহ সালমানের পক্ষ থেকে তার ভাই ও মক্কা মুকাররমার গভর্নর আমির খালিদ আল-ফায়সাল পুরস্কার বিতরণ করেন। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। শিহাব উল্লাহ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর তাহফিজুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়ায়। বাবার নাম নেয়ামতুল্লাহ মাহবুব।