হাশরের মাঠে অন্যতম ভীতিকর দৃশ্যপট হচ্ছে মানুষের সামনে জাহান্নাম প্রদর্শন করা। দুনিয়ায় করা মানুষের পাপের পরিণাম কেমন ভয়াবহ হবে তা কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্য সবার সামনে জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘সেদিন (হাশরের মাঠে) জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। সেদিন মানুষ উপলব্ধি করবে, কিন্তু সে উপলব্ধি কী কাজে আসবে!’ (সুরা ফাজর : ২৩)
হাশরের মাঠে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে কথা বলবে।
পৃথিবীতে করা সব আমল নিজ চোখে দেখবে। আমল মন্দ হলে পরিণাম কী হবে, তাও বান্দা সেদিন নিজ চোখে দেখতে থাকবে। হজরত আদি ইবনে হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, হাশরের মাঠে তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি কথা বলবেন, মাঝখানে কোনো দোভাষী থাকবে না। ওই সময় বান্দা অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক তাকাবে। যখন নিজের ডান দিকে তাকাবেÑ কেবল তার আমল দেখবে। যখন বাম দিকে তাকাবেÑ তখনও কেবল তার আমল দেখবে। আর যখন সামনের দিকে তাকাবে তখন জাহান্নামের আগুন দেখবে। সুতরাং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ; যদিও শুকনো এক টুকরো খেজুর সদকা করার মাধ্যমেও সম্ভব হয়।’ (বুখারি : ৭৫১২)
জাহান্নামকে টেনে আনা হবে
জাহান্নাম এত বিশাল হবে যে, হাশরের মাঠে তাকে টেনে আনতে বিপুল পরিমাণ ফেরেশতার প্রয়োজন হবে। হাজার হাজার ফেরেশতা টেনে টেনে জাহান্নামকে হাশরের মাঠে উপস্থিত করবেন। হজরত
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সেদিন হাশরের মাঠে জাহান্নামকে এমন অবস্থায় নিয়ে আসা হবে যে, তার সত্তরটি শেকল থাকবে। প্রত্যেকটি শেকলে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা থাকবেন। তারা শেকল ধরে টেনে টেনে তাকে উপস্থিত করবেন।’ (মুসলিম : ৭৩৪৩; ২৮৪২)
জাহান্নামের ভয়ঙ্কর উচ্চারণ
হাশরের মাঠে জাহান্নাম প্রচণ্ড আওয়াজে হুঙ্কার দিতে থাকবে আর ফনা তুলে মানুষের ওপর দিয়ে ঘুরাতে থাকবে। বিশেষত অপরাধী ও পাপাচারীদের সে খুঁজতে থাকবে। হজরত আবু সায়িদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন যখন সব মানবজাতিকে একই সমতল জমিনে (হাশরের মাঠে) সমবেত করা হবে, তখন সেখানে জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে। জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখাসমূহের একটি আরেকটির ওপর উঠে যেতে থাকবে এবং ভেতরের উত্তপ্ত লাভা উদ্গীরিত হয়ে অন্য অংশকে গর্ভে চালান করে দিতে থাকবে। আর বলতে থাকবেÑ আমার রবের পরাক্রমের কসম! আমার আর আমার সঙ্গীর মাঝখানে এমন কিছু মানুষ বাঁধা হয়ে আছে, যাদের একেকটা করে গর্দান আমি চাই। হাশরের মাঠের সবাই তখন জিজ্ঞাসা করবে, কে তোমার সঙ্গী? জাহান্নাম বলবে, (পৃথিবীতে থাকা অবস্থায়) প্রত্যেক অহঙ্কারী ও ক্ষমতার বাহাদুরেরা!’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা : ২/১১৪৫)
মানুষের মতো কথা বলবে জাহান্নাম
জাহান্নামকে সেদিন মানুষের মতোই কথা বলার শক্তি দেওয়া হবে। এ সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন হাশরবাসী সবার ওপর জাহান্নামের দীর্ঘ ও লম্বা ঘাড় বের হয়ে আসবে। তার দুটো চোখ থাকবে ঘূর্ণায়মান, দুটো শ্রবণেন্দ্রিয় থাকবে যা দিয়ে সব শুনবে, জবান থাকবে যা দ্বারা সে সুস্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলবে। সেদিন জাহান্নাম বলতে থাকবেÑ আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে ওই সব লোকদের ব্যাপারে যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাসক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, যারা অহঙ্কার ও প্রতাপ প্রদর্শন করেছিল, যারা অন্যকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল।’ (তিরমিজি: ২৫৭৪; মুসনাদে আহমাদ : ২/৩৩৬)। আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) বলেছেন, রাসুল (সা.)-এর বক্তব্য ‘জাহান্নাম সেদিন তার রবের কাছে অভিযোগ করবে’-এর ব্যাখ্যায় গবেষক আলেমগণ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা হাশরের মাঠে জাহান্নামকে উপস্থিত করবেন এবং প্রকৃত অর্থেই জাহান্নামের জবান খুলে দেবেন, কথা বলার সুযোগ করে দেবেন; যেমনিভাবে মানুষের হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেও কথা বলার সুযোগ করে দেবেন।’ (ফাতহুল বারি : ৩/৭০)
জান্নাত-জাহান্নামের স্বাদ আস্বাদন
জাহান্নামের ভয়বহতা ও জান্নাতের সুখময়তা কেমন হবে তা হাশরবাসীকে চোখে দেখার সুযোগ দেওয়া হবে। একজন জাহান্নামী ও একজন জান্নাতিকে সামান্য সময়ের জন্য জাহান্নামে ও জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে স্বাদ চাখিয়ে পুনরায় হাশরের মাঠে ফিরিয়ে আনা হবে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন হাশরের মাঠে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, যে পৃথিবীর জীবন অনেক আরাম-আয়েশ ও প্রাচুর্যের সঙ্গে অতিবাহিত করেছে এবং জাহান্নামের ফয়সালা হয়েছে। তাকে কিছুক্ষণের জন্য জাহান্নামের দরজায় রেখে ফিরিয়ে আনা হবে। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদমের সন্তান! তুমি কি পৃথিবীর জীবনে কখনও ভালো অবস্থা দেখেছ? কখনও সুখ লাভ করেছ? সে আল্লাহর কসম করে বলবে, হে রব! না, কখনও না! আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এত কষ্ট ও বেদনা অনুপ্রবেশ করেছে যে, কোনো শান্তি-সুখের কথা আমার স্মরণেই আসছে না। অনুরূপভাবে আরেকজন ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, যে পৃথিবীর জীবন অনেক কষ্টে-ক্লেশে অতিবাহিত হয়েছে এবং জান্নাতের ফয়সালা হয়েছে। তাকে জান্নাতের দরজায় কিছুক্ষণের জন্য রেখে ফিরিয়ে আনা হবে। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, হে আদমের সন্তান! পৃথিবীতে তুমি কি কখনও কষ্ট দেখেছ? কখনও কষ্টকর সময় তোমার ওপর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে? সে আল্লাহর কসম করে বলবে, হে আমার রব! না, কখনও না! কখনও কোনো কষ্ট আমার পৃথিবীর জীবনে আসেনি, আমি কখনও কোনো কষ্ট দেখিনি। আমার শরীরে-হৃদয়ে এত সুখময়তা ছড়িয়ে পড়েছে যে, কোনো দুঃখ-দুর্দশার কথা আমার স্মরণেই আসছে না।’ (মুসলিম : ৭০৮৮)
অতএব বোঝা গেলÑ দুনিয়ায় আরাম-আয়েশ করাই শেষ কথা নয়। পরকালে যদি জান্নাত অর্জন না করতে পারিÑ তাহলে ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হবে জাহান্নামে। আর দুনিয়ায় যদি কষ্ট-দুর্দশায় থেকেও আল্লাহর হুকুম আহকাম সঠিকভাবে পালন করে যেতে পারিÑ তাহলে পরকালে চির সুখে থাকার সুযোগ হবে আল্লাহর দেওয়া জান্নাতে। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।
হাশরের মাঠের আরও আলোচনা পড়ুন আগামী বৃহস্পতিবার