ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

পুরো স্টেডিয়ামে গর্জে উঠেছিল জয় বাংলা স্লোগান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২২, ১২:৩৬ পিএম  (ভিজিট : ২৯৫)
মুক্তিযুদ্ধের বছরে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি খেলা শুরু হয়। চার দিনের আন-অফিসিয়াল টেস্ট ম্যাচ, পাকিস্তান বনাম আন্তর্জাতিক একাদশ। ওই ম্যাচে আমি ১১ জনের দলে অন্তর্ভুক্ত হই। তখন আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙালি জাতির বুঝতে বাকি ছিল না, ইয়াহিয়া-ভুট্টো ষড়যন্ত্র করছে। সারা দেশে অস্থিরতা বিরাজমান। ছাত্রনেতারা বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছেন। যা হোক ২৬ ফেব্রুয়ারির আগে আমরা হোটেল পূর্বাণীতে উঠলাম।

তখন আমাদের খেলার সরঞ্জাম (প্যাড, ব্যাট যাবতীয় সব) ক্রিকেট বোর্ড থেকে দেওয়া হতো। আমার ব্যাট ছিল গান অ্যান্ড মূর কেন্নালস মার্কা। অন্যদের দেওয়া হয়েছিল ‘গ্লে নিকোলস’ ব্যাট। যেটার মার্কা ছিল তলোয়ার (লম্বালম্বিভাবে ব্যাটে লাগানো ছিল)। নির্বাচনের এই তলোয়ারই ছিল ভুট্টোর নির্বাচনি প্রতীক। যা দেখেই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিই। ওই সময় ‘জয় বাংলা’ স্লো গানটি খুব বড়ভাবে সামনে চলে আসে। জয় বাংলা ছিল বাঙালির চেতনা। বাঙালির ডাক। বাংলার জয়।
পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাটে লাল-হলুদ রঙে লিখে তৈরি করা হয়েছিল জয় বাংলা স্টিকার। যা লাগানো হতো গাড়ির কাচ, বাড়ির গেটে, পথেঘাটে। এককথায়, সর্বত্র। মূলত জয় বাংলা স্টিকারের মাধ্যমে সামনে আনা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বার্থ। আমিও চিন্তা করলাম, আমার ব্যাটে জয় বাংলা স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নামব। কারণ ম্যাচটির খবর প্রচার হবে বিভিন্ন দেশে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। ব্যাটে জয় বাংলা স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নামলাম।

মাঠে নামতে দেখেই ছবি তোলার জন্য সাংবাদিক ভাইরা আমাকে থামিয়ে দিলেন। সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে উঠতে সামান্য সময় লেগে যায় দর্শকদের। কিন্তু ৩০ সেকেন্ড সময় পর স্টেডিয়ামে থাকা সবাই জয় বাংলা স্লো গান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। যা এখনও আমার কানে বাজে। ওটাই ছিল আমার প্রতিবাদ। নীরব প্রতিবাদ। সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। যার জন্য আমাকে শোকজ করা হয়েছিল। যা হোক পরে বুঝলাম, ওটা একটি রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ। কারণ ওই সময় তো আমরা পাকিস্তান। পাকিস্তানে বসে আমি জয় বাংলা বলছি।

একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচে এমন ঘটনা যে এত বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে তা তখনও আমি বুঝিনি। তবে বুঝলেও আমি কেয়ার (তোয়াক্কা) করতাম না। আমি নীরব প্রতিবাদটা করব, কেবল ওটাই আমার মাথায় কাজ করেছিল। যেটার জন্য পুরো নয়টা মাস আমার নামে হুলিয়া ছিল। আমাকে দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ ছিল। যা আমি পরে জানতে পারি। যখন আমি মুশতাকের (শহিদ) লাশ দাফন করতে যাই তখন সাবেক ফুটবলার দিপু ভাই (শান্তিনগরে থাকতেন) আমাকে এটা জানায়।
তিনি বলেছিলেন, তুমি পালাও ঢাকা থেকে। তার কাছে খবর পাঠিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন ইউনুস (পাকিস্তান আর্মি)। তখন সে ফুটবল খেলত ইপিডিসিতে। সে আমাকে চিনত। ইউনুসই খবরটি পাঠায় দিপু ভাইয়ের মাধ্যমে। যা ২৫ মার্চের পরের ঘটনা। তার আগে কী হলো? ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাটে স্টিকার, নামলাম। ১ মার্চ, উত্তপ্ত মার্চ। যা এখন বলি আমরা। একাত্তরের সেই ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান কারও বুদ্ধিতে হয়তো ভুট্টোর বুদ্ধিতে স্থগিত করলেন পার্লামেন্ট। ৩ তারিখে বসার কথা ছিল। পার্লামেন্ট বসবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা দেখাব এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তখন সরকার গঠন করবে। ওদের (পাকিস্তানের) ভালো লাগেনি। ওরা চায়নি এটা হোক। তাই ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান সেই পার্লামেন্টের কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। আর দুপুরের দিকে যখন এই ঘোষণা আসে তখনই পুরো স্টেডিয়ামে গর্জে উঠেছিল জয় বাংলা স্লো গানে। মাঠের চারপাশে আগুন জ¦লছিল (প্যান্ডেল ছিল স্টেডিয়ামের চারদিকে)। আমরা খেলোয়াড়রা অবস্থান নিই ড্রেসিং রুমে।

পরে জানানো হলো, তোমরা ভয় পেয়ো না। নিরাপত্তার জন্য তোমাদের ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি তখনই বুঝে ফেলি, শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে। আর এদের সঙ্গে আমাদের থাকা হবে না। ইন্টারমিডিয়েট পাস করা আমার সেই মুহূর্তে অতটুকু বোঝার জ্ঞান ছিল, এখন আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু তখন হোটেল পূর্বাণীতে তার কার্যনির্বাহী কমিটি নিয়ে মিটিং করছিলেন। আর আমরাও কিন্তু থাকতাম হোটেল পূর্বাণীতে।

ম্যানেজারকে বলে দিই, আমি ক্যান্টনমেন্টে যাব না। হোটেলে ফিরব। মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে যাই স্টেডিয়াম থেকে। হোটেলে ফিরতেও অনেকটা বেগ পোহাতে হয়। কেননা আমি তো ছিলাম পাকিস্তানের খেলোয়াড়। তাই মুখ ঢেকে পেছনে থাকা সার্ভিস গেট দিয়ে কোনো রকমে প্রবেশ করি হোটেলে। এখনও সেই দিনের কথা মনে পড়লে ভাবি, আমি মরেও যেতে পারতাম। তবে বেঁচে আছি।

মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক অধিনায়ক
  বাংলাদেশ ক্রিকেট দল 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close