ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

যুদ্ধের সেই দিনে
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২২, ১২:৫৪ পিএম  (ভিজিট : ১৬০)
তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছে সকাল থেকে। বৃষ্টির মতো গুলি চলছে। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে সাত-আট কিলোমিটার দক্ষিণে রাজাপুর এবং সমেশপুর বাজার সংলগ্ন ওয়াপদা বাঁধের পূর্ব পাশে মুক্তিবাহিনীর অবস্থান। পাকিস্তানি মিলিটারিরা হুরাসাগর নদীর পাশ দিয়ে দুটি ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিতে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ। বলা যায় মিলিটারিরা ঘোরওয়ের মধ্যে পড়ে দিশেহারা। 

আমাদের বাহিনী পজিশন নিয়েছে বাজার থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে, একটি ঘন বাঁশঝাড়ের আড়ালে। পূর্ব এবং দক্ষিণ পাশে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে মিলিটারিরা যখন উত্তর দিকে সরে আসতে থাকে তখন আমরা উপর্যুপরি আক্রমণ করে ওদের ত্রাসের মধ্যে ফেলে দিই। 

আমাদের আক্রমণে টিকতে না পেরে ওরা যখন দক্ষিণ দিকে সরে যায় তখন আমাদের দক্ষিণের বাহিনী এলএমজির ব্রাশফায়ার শুরু করে। বেচারারা ভীষণ নাজুক অবস্থায় পড়ে গেছে। আজ তাদের রেহাই নেই। এটা তারাও বুঝে গেছে। তারপরও ওরা আত্মসমর্পণ করছে না। জানে, আত্মসমর্পণ করলেও ওদের পরিণতি যা হবে- না করলেও তাই হবে। ওরা নিরাপদ অবস্থান থেকে ক্রমাগত ‘আন্দা কুন্দা’ ফায়ার করে যাচ্ছে। 

বেলা মাথার ওপর থেকে গড়িয়ে পশ্চিমে হেলে পড়ছে। শীতকালের দিন। অনেক ছোট হয়ে গেছে দিনের আকার। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসবে। যুদ্ধের দামামায় এতক্ষণ ক্ষুধার কথা মনে হয়নি। কে একজন ক্ষুধার কথা বলতেই ক্ষুধাটা বেশ জানান দিয়ে উঠল। ক্রমে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে। পৃথিবীতে ক্ষুধাই একমাত্র শক্তি যে তার কাছে সবই তুচ্ছ। সবই কাবু। ক্ষুধার কাছেই মানুষ বারবার পরাজিত হয় এবং হয়ে এসেছে। মানুষের সব যুদ্ধই ক্ষুধার কারণে। একমাত্র ক্ষুধাই মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে এবং ক্ষুধার কারণে মানুষ অমানুষ হয়ে যায়। 

আমাদেরও ক্ষুধা তেতে উঠছে। রাতে চর এলাকায় যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সকালে তারা আমাদের মুড়ি মাখানো খেতে দেয়। শর্ষে তেল কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখানো মুড়ি বেশ মজা করেই খাচ্ছিলাম আমরা। খাওয়ার মাঝপথে সেই সময় ভয়ংকর খবরটি এলো, ‘মিলিটারি পালিয়ে যাচ্ছে।’ 

এরপর আর আমাদের স্বাভাবিক জীবন থাকে না। খবরটি শোনামাত্র ছিটকে পড়লাম আমরা নিজের হাতিয়ারটি হাতে তুলে নেওয়ার জন্য। যুদ্ধে একমাত্র বন্ধু হলো নিজের অস্ত্র। যুদ্ধের সময় একমাত্র সেই কেবল বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। 

কমান্ডারের নির্দেশে আমরা তার পেছনে ছুটতে শুরু করলাম। মুড়ি খেয়ে পানিও পান করা হয়নি। দৌড়ুতে গিয়ে বুঝলাম গলা-বুক শুকিয়ে আসছে। কিন্তু দুপাশে জনতার উল্লাস আমাদের সব ভুলিয়ে দিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমরা অস্ত্র হাতে ছুটে যাচ্ছি। আর গ্রামের সাধারণ মানুষ আমাদের ত্রাতা ভেবে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে উল্লাস করে উঠছে। তাদের সেই উল্লাস ধ্বনি আমাদের দেহ-মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। তখন শুধু একটি মাত্র ভাবনা, এই মানুষদের রক্ষা করতে হবে। এরাই আমাদের ক্ষমতার মূল শক্তি। 

আমরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে অস্ত্র হাতে ছুটে যাচ্ছি আর বিভিন্ন বাড়ির আনাচে-কানাচে যে যেখান থেকে আমাদের দেখছে সেখান থেকেই জয় বাংলা ধ্বনিতে আমাদের সাহস যোগাচ্ছে। 

কমান্ডারের নির্দেশে আমরা বাজারের উত্তর দিকে বাঁশঝাড়ের আড়ালে গিয়ে অবস্থান নেই। অবস্থান নেওয়ার পর পরই আমরা বুঝতে পারি এখানে আমাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা তেমন নেই। কিন্তু আমাদের অবস্থানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওদের পালিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথই এটা। আর সেই পথে পাকিস্তানিদের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছি আমরা। তাদের পালানোর আর কোনো পথ নেই। 

বিকেল ধেয়ে আসছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। পেট যে আর কিছুই মানছে না। একজন যোদ্ধা সেকথা বলেই ফেলল। বলল, ‘কমান্ডার, কাউকে গ্রামের দিকে পাঠান। আমাদের জন্য কিছু রসদ নিয়ে আসুক। আর যে সহ্য করতে পারছি না।’ 

‘কমান্ডার বললেন, ‘বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হবে।’ 

দলের একজন ফাঁকিবাজ যোদ্ধা আছে, তার নাম মইনুল। যুদ্ধের কথা শুনলে ওর গায়ে জ্বর চেপে আসে। যেই সেই জ¦র না। রীতিমতো গা কাঁপিয়ে ১০৫ ডিগ্রি জ¦র। তাকে সহজে কোনো যুদ্ধে নেওয়া যায় না। গায়ে জ¦র এমন সৈনিককে যুদ্ধে নেওয়া মানে বিপদ ঘাড়ে নেওয়া। 

সেই মইনুল যখন বলল, ‘আমি গিয়ে দেখি কিছু পাওয়া যায় কি না’- তখন সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন প্রতিবাদ করে বলল, না-না দরকার নেই। ব্যাটার পালানোর মতলব।’ 
এই কথায় সবাই হেসে উঠল। কমান্ডার হাসি থামিয়ে বললেন, ‘আজ পালানোর চেষ্টা করলে, রাইফেলের নল ঘুরিয়ে ওর দিকে তাক করব। তারপর ট্রিগারে দেব চাপ।’ 
কমান্ডারের কথায় মইনুলের ফর্সা চেহারা কালো হয়ে গেল। বাকিরা উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল। এভাবে হাস্যরসের মধ্যে আরও কিছু সময় কেটে গেল। একসময় শক্ত মানুষ কমান্ডার হাবিব নিজেই ডেপুটি কমান্ডারকে বললেন, ‘ক্ষুধা তো কিছু মানতে চাইছে না। কী করা যায় বলো তো?’ 

ডেপুটি কমান্ডার বললেন, ‘দায়িত্বশীল কাউকে পাঠিয়ে আশপাশে কিছু পাওয়া যায় কি না দেখা যেতে পারে।’ 

কমান্ডার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘তুমি যাও।’ 

আমি এসএলআর কাঁধে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই লক্ষ করলাম বাঁধের পাশ দিয়ে একজন কিশোর দৌড়ে আমাদের দিকে আসছে। আমি কমান্ডারের দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করলে তিনি আমাকে অপেক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। একটু পর কিশোরটি হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের কাছে এলো। কাছে এলে দেখলাম, ওর হাতে গামছার পোঁটলায় কী যেন বাঁধা। কিশোর ছেলেটি গামছার গিঁট খুললে অনেকগুলো আটার রুটি দেখে আমাদের সবার চোখ চকচক করে ওঠে। রুটি আর আখের গুড়। কমান্ডার সবার হাতে রুটি আর এক দলা গুড় ধরিয়ে দিলে আমরা বুভুক্ষের মতো খেতে থাকি। এত স্বাদ পাচ্ছিলাম যে, জীবনে এত স্বাদ আর কখনো পাইনি। মুহূর্তেই রুটি নিঃশেষ হয়ে যায়। 
কিশোর ছেলেটি রুটি রেখে পানি আনতে তখনই ছুটে গেছে। সবাই হাঁ মুখে ছেলেটির পথের দিকে তাকিয়ে আছি। একটু পর ছেলেটি পানিভর্তি ছোট একটি মাটির কলসি নিয়ে হাজির। পানি খাওয়ার পর মনে হলো দেহে প্রাণ ফিরে এসেছে। কমান্ডার হাবিব ছেলেটিকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমরা যে ক্ষুধার্ত, আমাদের যে খাদ্য দরকার সেটা তুমি কীভাবে বুঝলে?’ 

ছেলেটি বলল, ‘আপনারা রাতে আমাদের বাড়িতে ছিলেন। সকালে মুড়ি না খেয়েই যুদ্ধে চলে এসেছেন। দুপুরে খাওয়ার সময় মা বলল, ‘ওনারা তো সকাল থেকে যুদ্ধ করছে। পেটে মনে হয় দানাপানি পড়েনি। আমি কয়েকটা রুটি বানিয়ে দেই। তুই নিয়ে যা।’ 

‘তোমার মা বলেছে এই কথা?’ 
‘জি।’ 
‘এই তোমরা শুনছ, আমাদের স্বাধীনতা পৃথিবীর কোনো শক্তি আর রুখতে পারবে না। বাংলার মা-বোনেরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা এতক্ষণ যে খাওয়া খেলাম সেই খাওয়া একজন মা আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।’ কমান্ডার বললেন কণ্ঠ তুলে এবং আনন্দের সঙ্গে। কিন্তু বলতে গিয়ে কণ্ঠ ধরে এলো তার। চোখ টলমল করছে। আমাদেরও আবেগে চোখে পানি চলে আসে। 

আমাদের কেউ কেউ কিশোর ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। একটু পর আমরা আবার যুদ্ধের দিকে মনোযোগী হলাম। 

এ সময় লোক মারফত খবর এলো পাকিস্তানি মিলিটারি সারেন্ডার করবে। অস্ত্র উঁচিয়ে আমাদের হুরাসাগর নদীর দিকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। কিশোর ছেলেটিও আমাদের সঙ্গী হলো। ওর চোখেমুখে অপার কৌতূহল। যেতে যেতে আমাকে প্রশ্ন করল, ‘ওদের এখন আপনারা কী করবেন?’ 

বললাম, ‘যুদ্ধে কেউ সারেন্ডার করলে তাকে আর শাস্তি দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানার সুযোগ
কোথায়?’ 
‘কেন?’ 
বললাম, ‘আমাদের নিজেদেরই থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা ওদের নিয়ে কোথায় রাখব?’ 
‘তাহলে?’ 
‘তাহলে যা হওয়ার তা-ই হবে। ওরা নিজেরাই ওদের ভাগ্য ঠিক করে নিয়েছে।’   

আরএস/ 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close