
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে সরকার খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি তেল আমদানির দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি কৃষির উৎপাদন যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় তার জন্য সার আমদানির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য দেশের নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে কম দামে পণ্য তুলে দিতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য ২৬৫ কোটি টাকার ভোজ্য তেল ও ডাল কিনবে সরকার। একই সঙ্গে ৪৫ হাজার টন সার কেনা হবে।
গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এসব পণ্যের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন পায়। পরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহবুব খান।
সাঈদ মাহবুব খান জানান, টিসিবির জন্য ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিকটন সয়াবিন তেল এবং ৮ হাজার মেট্রিকটন মসুর ডাল কিনবে সরকার। এতে খরচ হবে ২৬৫ কোটি ৪০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড থেকে ১ কোটি ১০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ১৯১ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন টিসিবির জন্য এই সয়াবিন তেল কেনা হবে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম পড়বে ১৭৪ টাকা ৫০ পয়সা। আগের ক্রয়মূল্য ছিল ১৭৬ টাকা ৮০ পয়সা।
অতিরিক্ত সচিব জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের আরবিল বাকলিয়াত হুবুবাত সান্তিক কোম্পানি থেকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৮ হাজার মেট্রিকটন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ডাল আমদানি করতে খরচ হবে ৭৩ কোটি ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। প্রতি মেট্রিকটন মসুর ডালের দাম পড়বে ৮৫৮ মার্কিন ডলার। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে এ ডাল আমদানি করা হবে।
এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি মেঘনা অ্যাডিবল অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল ও তুরস্কের আরবিল বাকলিয়াত হুবুবাত সান্তিক থেকে ৮ হাজার টন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। তেল কিনতে ১৯৪ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মসুর ডাল কিনতে ৭৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ১ কোটি ১০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯ জানুয়ারি শুন শিং অ্যাডিবল অয়েল লিমিটেডের কাছ থেকে ২০০ কোটি ২০ লাখ টাকায় ১০ লাখ মেট্রিকটন সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ৮১ কোটি ১৮ লাখ টাকায় সেনা অ্যাডিবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রির কাছ থেকে ৪৪ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে শুন শিং অ্যাডিবল অয়েল লিমিটেড থেকে ৫৫ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা। এ জন্য ব্যয় ধরা হয় ১০১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটারের দাম ধরা হয় ১৮৪ টাকা ৫০ পয়সা।
এ ছাড়া ওই সভায় ওমানের জাদ আল রাহিল ইন্টারন্যাশনাল এলএলসি সুলতানাত থেকে ১৫১ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় ১ কোটি ১০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আরবিল বাকলিয়াত হুবুবাত সান্তিক এএস থেকে ৮১ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকায় ৮ হাজার মেট্রিকটন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
ফ্যামিলি বা পরিবার কার্ডের আওতায় একজন কার্ডধারীর কাছে সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি ও দুই কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছে টিসিবি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১১০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকা, ১ কেজি মসুর ডাল ৬৫ টাকা ও প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে শুধু সিটি করপোরেশন এলাকা ও টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোয়।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধানের আওতায় জাপান থেকে আরও এক কার্গো বা ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতি এমএমবিটিইউর জন্য ১৬ দশমিক ৫০ ডলার খরচ ধরে এক কার্গো এলএনজির জন্য খরচ হবে মোট ৬৯০ কোটি ৪২ লাখ ৯ হাজার ৩১২ টাকা।
মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট বা মিলিত ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে (এমএসপিএ) স্বাক্ষর করা প্রতিষ্ঠান থেকে কোটেশন সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় এ এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার মাধ্যমে এই এলএনজি আমদানি করা হবে জাপানের এমএম জেরা করপোরেশনের কাছ থেকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় আট মাস খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রেখেছিল সরকার। দাম কিছুটা কমে আসায় দেশের চাহিদার কথা মাথায় রেখে গত ১ ফেব্রুয়ারি এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা তখন জানিয়েছিলেন, ফরাসি কোম্পানি টোটালএনার্জিস থেকে এক কার্গো (৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ) এলএনজি কেনা হচ্ছে, যা ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ দেশে পৌঁছাবে। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম পড়বে ২০ ডলারের কাছাকাছি। এর আগে সিঙ্গাপুরের ভিটল এনার্জির কাছ থেকে ২০২২ সালের মে মাসের শেষ দিকে সবশেষ এক কার্গো এলএনজি কিনেছিল সরকার, যেখানে প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছিল ২৫ দশমিক ৭৫ ডলার।
সার কেনা হবে ৪৫ হাজার টন : এ ছাড়া চট্টগ্রামের ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের জন্য ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ ৯৭ হাজার ১৩৮ টাকায় ৪৫ হাজার মেট্রিকটন ফসফরিক অ্যাসিড এবং রক ফসফেট কিনছে সরকার। এর মধ্যে ২০ হাজার টন ফসফরিক অ্যাসিড এবং ২৫ হাজার টন রক ফসফেট রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে এই সার কেনা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহবুব খান জানান, সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃক চট্টগ্রামের ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) জন্য ২০ হাজার মেট্রিকটন ফসফরিক অ্যাসিড কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ১০০ টাকা।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের আর এক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বিসিআইসি কর্তৃক চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের (টিএসপিসিএল) জন্য ২৫ হাজার মেট্রিকটন রক ফসফেট কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মেসার্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনপুট থেকে ৮৮ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৩৮ টাকা দিয়ে এই ফসফেট কেনা হবে।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর কর্তৃক ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় খয়রাবাদ নদীর ওপর ৭৩০ মিটার ব্রিজ নির্মাণের পূর্ত কাজ যৌথভাবে এমএম বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পোদ্দার এন্টারপ্রাইজকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ১২৩ কোটি ৯ লাখ ৭১ হাজার ৮২ টাকা।