ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

শিশু নিপীড়নে অনিরাপদ চট্টগ্রাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ১:০৫ এএম  (ভিজিট : ২২৮)
চট্টগ্রাম মহানগরীতে একের পর এক ঘটছে কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ছেলে শিশুরাও। এর পাশাপাশি প্রায়শই চট্টগ্রামের অলিগলিতে শোনা যায় শিশু নিখোঁজের মাইকিং। সবমিলে শিশুদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে অভিভাবকরা। ইতোমধ্যেই অনেক মা-বাবা তাদের শিশুদের স্কুল-মাদরাসায় পর্যন্ত কম পাঠানো শুরু করেছে।

পুলিশ বলছে, তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে ঠিকই। তবে এসব অপরাধ কমছে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের প্রতি এই অপরাধ প্রবণতার নেপথ্যে রয়েছে পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও যৌন উদ্দীপনা। এদিকে অপরাধবিজ্ঞানী ও আইনবিশেষজ্ঞরা দুষছেন আইনের ফাঁকফোকর ও মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে।

এক বছরে সংঘটিত শিশু নিপীড়নের কয়েকটি ঘটনা : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিট্রন পুলিশের (সিএমপি) তথ্য মতে, গত বছরের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের নথিবদ্ধ হয়েছে ২৯টি। আর শিশু নিখোঁজের ঘটনা ৬৮টি। এর মধ্যে সর্বশেষ গত রোববার ১৭ সেপ্টেম্বর নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন সানোয়ারা আবাসিক এলাকায় বাসায় ঢুকে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করা হয় তানহা আক্তার মারিয়া নামের ৭ বছরের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে। চান্দগাঁও থানার ওসি খায়রুল ইসলাম বলেন, শিশু তানহা হত্যার ঘটনায় জড়িত আসামি মুন্নাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মুন্না ধর্ষণের পর তানহাকে হত্যা করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। মামলার পর তাকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।

এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর নগরীর চান্দগাঁও থানা এলাকা থেকে অপহরণ করা হয় ৩ বছরের শিশু আবদুল্লাহকে। এ ঘটনার দুদিন পর তাকে নগরীর জিইসি এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার করে পুলিশ। ২১ মার্চ নগরীর পাহাড়তলী এলাকার বাসা থেকে আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সি আবিদা সুলতানা আয়নী ওরফে আঁখি মনি। ঘটনার ৮ দিন পর একই এলাকা থেকে তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রুবেল নামের এক সবজি বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হয়। গত বছর ২৭ নভেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় বাসায় বাবা-মা না থাকার সুযোগে পৌনে ২ বছর বয়সি কন্যশিশুকে ধর্ষণ করে পাশের ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী দুলাল। পর দিন শিশুর মায়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত দুলালকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বছরের ১৫ নভেম্বর নগরীর ইপিজেড এলাকায় বাসার পাশে আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় ৫ বছর বয়সি আলিনা ইসলাম আয়াত।

ঘটনার ৯ দিন পর জড়িত সন্দেহে আবির নামের এক তরুণকে গ্রেফতার করা হয়। মুক্তিপণের জন্য আয়াতকে অপহরণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি দেয় আবির। এর এক সপ্তাহ আগে ২ নভেম্বর নগরীর আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট জোন্স রোড এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয় ৫ বছর বয়সি আরেক কন্যাশিশু। এ ঘটনায় আলমগীর খান নামের এক রিকশাচালককে গ্রেফতার করা হয়। এর ১০ দিন আগে নগরীর জামালখান এলাকায় নিখোঁজ হয় ৭ বছর বয়সি মারজানা হক বর্ষা। নিখোঁজের ৩ দিন পর একই এলাকার সিকদার হোটেলের পাশের নালা থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 

২০২২ সালের ১৫ অক্টোবর নগরীর খুলশী থানার ঝাউতলা এলাকায় খাবারের লোভ দেখিয়ে ৮ বছর বয়সি এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করে খাবার হোটেল মালিক নজির আহম্মদ। এ ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হলেও মামলাটি এখনও প্রক্রিয়াধীন। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর নগরীর বন্দর থানার পোর্ট কলোনি এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাসা থেকে ৭ বছর বয়সি সুরমা নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনা করে ওসমান হারুন মিন্টু নামের এক রিকশাচালককে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

শিশুদের স্কুল-মাদরাসায় পাঠাতে ভয় পাচ্ছে অভিভাবক : চট্টগ্রামে একের পর এক শিশু নিপীড়ন ও হত্যার ঘটনায় অসহায়ত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে নিম্নবিত্ত কর্মজীবী বাবা-মায়েরা। এর মধ্যে নগরীর রৌফাবাদ এলাকায় পোশাকশ্রমিক মো. জসিম ও তার স্ত্রী বলেন, ১২ বছর বয়সি শিশুকন্যাকে প্রতিদিন বাসায় একা রেখে কর্মস্থলে যায়। কিন্তু মেয়েটারে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকি। 

ধারাবাহিক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ভীত হয়ে পড়েছে অভিভাবকরা। সে কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আলাপকালে বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর হাজারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শামিম আরা আক্তার জাহান। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামে শিশু নিপীড়নের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেক শিশু স্কুলে কম আসছে। অভিভাবকরা তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠানোর চেয়ে বাসায় রেখে দিচ্ছে বেশি। এরপরও থামছে না শিশু নিপীড়নের ঘটনা। 

কী বলছে পুলিশ : সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, কর্মজীবী মায়েরা সারা দিন বাইরে থাকায় শিশুরা বাসায় একা ও অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এই সুযোগ নেয় মানসিক বিকারগ্রস্ত নরপিশাচরা। এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ সুপার (এসপি, চট্টগ্রাম মেট্রো) নাঈমা সুলতানা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে এগুলো আমাদের কাছে ক্রাইম, আমরা ক্রাইম ধরে নিয়েই কাজ করি। আমরা তো চেষ্টা করছিই এগুলো যেন কমানো যায়, কিন্তু এসব ঘটছেই। ঘটনাগুলোর কারণ সমাজবিদ বা মনোবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন।

সমাজবিজ্ঞানী, আইন বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতামত : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞানী ড. এ. এফ. ইমাম আলী সময়ের আলোকে বলেন, পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও যৌন উদ্দীপনার মতো বিষয়গুলোর কারণে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো অপরাধ বাড়ছে। এসব অপরাধপ্রবণতা সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। তিনি বলেন, অপরাধীরা যৌন নিপীড়নের জন্য সাধারণত শিশুদেরকে বেশি টার্গেট করে। কারণ শিশুরা যথাযথভাবে এসব ঘটনা তুলে ধরতে পারে না তার পরিবার ও সমাজের কাছে। ফলে বিষয়গুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও সুস্পষ্টভাবে ওঠে আসে না। তাই অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে যায়।

অপরাধ বিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এ ধরনের অপকর্ম বা বীভৎস কর্মের প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের পরিবার গঠনের প্রক্রিয়া সঠিক পন্থায় যাচ্ছে না। অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যাওয়াকেও দুষলেন এই অপরাধ বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভুক্তভোগীরা আইনের সুরক্ষা কতটা পাচ্ছে। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে আইনের প্রক্রিয়া ও প্রয়োগ সংশোধন করতে হবে। এসব ঘটনা বন্ধে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধের দিকে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, নিপীড়িনের শিকার এসব শিশুর অধিকাংশ দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবারের। কেউ কেউ কর্মজীবী শিশু-কিশোর, কেউ বস্তিতে থাকে, তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিটি অলিগলিতে, প্রত্যেক জেলা-উপজেলায়, শহরে-নগরে, প্রত্যেক ওয়ার্র্ডে এমন সব প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেখানে তাদের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান সময়ের আলোকে বলেন, শিশু নিপীড়নের ঘটনায় মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। এ কারণে নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের ঘটনায় ১ মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। ২ মাসের মধ্যে ট্রায়াল শুরু করে ৩ মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা করতে হবে। সেই সঙ্গে এসব ঘটনা বন্ধে শহরের অলিগলি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, মামলায় দীর্ঘসূত্রতা নেই তা বলা যাচ্ছে না। তবে আইন সংশ্লিষ্টরা যে অবহেলা করছেন, তা নয়।


সময়ের আলো/আরএস/




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close