পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি ভালো নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

দেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকরা বর্তমানে যে ৮ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি পান, তা মোটেই ভালো মজুরি নয় বলে

2023-10-04T01:48:33+00:00
2023-10-04T01:48:33+00:00
 
  রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি ভালো নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৩, ১:৪৮ এএম 
দেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকরা বর্তমানে যে ৮ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি পান, তা মোটেই ভালো মজুরি নয় বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা। গতকাল মঙ্গলবার তৈরি পোশাক খাতের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরকে টেকসই করার বিষয়ে আয়োজিত এক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এ সংলাপ আয়োজন করে।

এ সময় দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি মোটেও ভালো নয়। আর কত দিন এ মজুরি থাকবে, বর্তমানে সেটাই জরুরি প্রশ্ন।

সংলাপে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম প্রধান অতিথি ছিলেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্দ্রা বার্গ ভন লিন্ডে ও ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলি। প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম, বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড থিজ উডস্ট্রা।

ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি বলেন, আমাদের এখন শোভন মজুরি ও তা নিশ্চিতে ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। পাঁচ বছর আগে সর্বশেষ মজুরি বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি সাধারণ পরিবারের জন্য আট হাজার টাকা মোটেও ভালো মজুরি নয়। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্যোক্তা ও সরকারের পাশাপাশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের উপপ্রধান থিজ উডস্ট্রা বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে ন্যূনতম মজুরির ফাঁদ থেকে বের হতে হবে। এ অবস্থায় দেশের পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আর কত দিন পর্যন্ত ৮ হাজার টাকা থাকবে, বর্তমানে এটিই জরুরি প্রশ্ন।

অনুষ্ঠানে থিজ উডস্ট্রা আরও বলেন, প্রবৃদ্ধিও মডেল নিয়ে বাংলাদেশের পুনরায় চিন্তা করা প্রয়োজন। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ফলে বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের পোশাক খাতের ৪৫ লাখ শ্রমিকের কথা চিন্তা করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার বিকল্প নেই। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো মুনতাসির কামাল। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সবুজায়নে বড় কারখানায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে ৯৬.৮৬ শতাংশ।

এদিকে সেমিনারে জানানো হয়, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ব স্বীকৃত সবুজ কারখানার সনদ পেয়েছে বাংলাদেশের শতাধিক পোশাক কারখানা। ফলে বড় কারখানায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে ৯৬.৮৬ শতাংশ। আর চিকিৎসা খরচ কমেছে ৮৯.৫৮ শতাংশ।

সিপডির এই ডায়ালগে তৈরি পোশাক খাতের সবুজায়ন নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো মুনতাসির কামাল। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ৪০৩ ফ্যাক্টরি থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও ৪৫৪১ কর্মকর্তা, কর্মচারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় প্রতিষ্ঠানে সবুজায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বড় কারখানার ৯৬.৮৬ শতাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে, ৮৯.৫৮ শতাংশ চিকিৎসা খরচ কমেছে। অন্যদিকে কারখানা ও কর্মচারীদের কর্মক্ষমতা যথাক্রমে  ৮৪.১৬ শতাংশ ও ৯৫. ০৭ শতাংশ বেড়েছে। বড় ফ্যাক্টরির মুনাফা বেড়েছে ৩৪.০৯ শতাংশ।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে সবুজায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে ৮১.৫৪ শতাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে, ৬৫.২০ শতাংশ চিকিৎসা খরচ কমেছে। অন্যদিকে কারখানা ও কর্মচারীদের কর্মক্ষমতা যথাক্রমে ৬৪.৫৯ শতাংশ ও ৭৬.৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এই ধরনের ফ্যাক্টরির মুনাফা বেড়েছে ৩৩.৮০ শতাংশ।

সবুজায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে মাইক্রো কারখানার ৮৪.৪৮ শতাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে, ৬৩.১৩ শতাংশ চিকিৎসা খরচ কমেছে। অন্যদিকে কারখানা ও কর্মচারীদের কর্মক্ষমতা যথাক্রমে ৬৩.৮৭ শতাংশ ও ৭৫.৭১ শতাংশ বেড়েছে। মাইক্রো ফ্যাক্টরির মুনাফা বেড়েছে ১৫.৯৫ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, তদারকি, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়সহ নানা কারণে পোশাক কারখানায় সবুজায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক কারখানার বিভিন্ন ধরনের সবুজায়ন সার্টিফিকেট নিয়েছে। এর পাশাপাশি দেখছি-লিড একটা সার্টিফিকেশন আছে, যেটা ইউএস জিএফের অধীনে হয়ে থাকে। সেটার মধ্যে এনার্জি, ওয়াটার, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, কেমিক্যাল ওয়েস্ট এই সবই আছে। সেই সার্টিফিকেট প্রায় ২০০ কারখানা নিয়েছে, আর ৪০০-৫০০ পাইপলাইনে আছে।

তিনি বলেন, আমরা যখন বায়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি, তখন শুনছি তাদের চাহিদা ভিন্ন। সবুজের সংজ্ঞা, সূচক ভিন্ন এই সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে। সেখানে এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এই চাহিদাগুলো যদি একীভূত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা হলে রফতানিকারকদের সুবিধা হয়। একেক রফতানিকারকের চাহিদা একেক রকম, লিডকে অনেক বায়ারই স্বীকার করতে চায় না। তার মানে আরও প্রস্তুতি নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, এই গবেষণা আমাদের নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করবে। আমরা সবুজ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে মনোযোগী হয়েছি। রফতানিতে পোশাক খাতের অবদান ৮৫ শতাংশ। এখানে সবুজায়নের পাশাপাশি দূষণও কমাতে হবে।

তিনি বলেন, এনফোর্সমেন্ট ও রেগুলেশন এগুলো গভর্ন্যান্স ইস্যু। এইটা সবচেয়ে কঠিন। এনফোর্সমেন্ট ও রেগুলেশন ঠিকমতো হলে আমাদের বাজার অর্থনীতি ঠিকমতো কাজ করে। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব। বাজার যাতে কাজ করতে পারে। এতে পরিবেশের ওপর যেন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে সেটা দেখা সরকারের দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে বাজারে কোনো রকম খবরদারি না করে বাজারকে সহযোগিতা করা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোর মধ্যে যেন সবাই কাজ করে সেটা দেখা সরকারের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতের প্রাইস ফরমেশন সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারে না, প্রাইস চাইতেও পারে না। বায়ারদের কাছ এটা চাইতে হবে শিল্প মালিকদের। ভালো পণ্য চাইতে হলে, সবুজায়ন চাইলে বায়ারদের প্রিমিয়াম প্রাইস দিতে হবে কারণ আমরা জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের মধ্যে আছে। এ ক্ষেত্রে সরকার সবুজায়ন করার ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা দিতে পারে।

বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, আমাদের সবুজ কারখানা গ্লোবাল মডেল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আমার মনে হয়, সিপিডিকে অন্যান্য দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। পোশাক কারখানা এরই মধ্যে তীব্র নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ২০০-এর অধিক সবুজ কারখানা আমাদের আছে। ৭৩টি প্লাটিনাম রেটিং, ১৫০টি গোল্ড, ১০টি সিলভার রেটিং। বিশে^^র সেরা ১৫টি লিড ফ্যাক্টরির ১৩টি বাংলাদেশে। ৫০০০ ফ্যাক্টরি সবুজায়ন সার্টিফিকেট নেওয়ার পথে আছে।

ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়াল বলেন, আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া যতই সবুজ হোক না কেন, বের হওয়া পণ্যটি যদি সবুজ না হয়, এটা ভবিষ্যতে বড় সমস্যা সৃষ্টি করবে। ফ্যাশন কোম্পানিগুলোকে ২০৩০ সাল নাগাদ উৎপাদনের একটা অংশ রিসাইকেল টেক্সটাইল দিয়ে করতে হবে। আমাদের রিসাইকেল করা যায় এমন বর্জ্যরে উৎসের প্রয়োজন। এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বছরে ৫.৮ ট্রিলিয়ন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপন্ন করে। আমরা যদি সেটা সংগ্রহ করতে পারি তা হলে রিসাইকল পণ্য উৎপাদনের বড় সমস্যা সমাধান করতে পারব। কিন্তু সরকার বর্জ্য নিয়ে বলতে চায় না।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: