আরবদের নিকৃষ্ট কাজ ও কুসংস্কারে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি নবীজির শৈশব ও যৌবনকালকে। বিশ্ব মানবতার পরতে পরতে যেসব মানবিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে এর সবই সমন্বয় ঘটেছিল নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রে। নবীজির জন্মের সময়ে আরবদের মূর্খতা এতটাই চরমে পৌঁছেছিল, তারা নির্লজ্জতাকে কিছুই মনে করত না। উলঙ্গ হয়ে পবিত্র কাবা তওয়াফ করত। পরস্পর পরস্পরের সামনে উলঙ্গ হয়েই মল ত্যাগ করত ও গোসল করত। এমন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বমানবতাকে শিখিয়েছেন লজ্জাশীলতার সবক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভীষণ লজ্জাশীল ছিলেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) নবুওয়াতের আগে কুরাইশদের সঙ্গে কাবাঘর সংস্কারের সময় পাথর তুলে দিচ্ছিলেন। তাঁর পরিধানে ছিল লুঙ্গি। তার চাচা আব্বাস (রা.) বললেন, ভাতিজা, লুঙ্গি খুলে কাঁধে পাথরের নিচে রাখলে ভালো হতো। জাবের (রা.) বলেন, তিনি লুঙ্গি খুলে কাঁধে রাখলেন এবং তৎক্ষণাৎ বেহুঁশ হয়ে পড়লেন। এরপর তাঁকে আর কখনো নগ্ন অবস্থায় দেখা যায়নি। (বুখারি : ৩৬৪)
নবীজি (সা.) ছিলেন পুরুষ ও নারীদের নবী, জিন ও মানুষের নবী। শরিয়তের বিধিবিধান বর্ণনা করা তাঁর দায়িত্ব ছিল। ফলে তার জীবদ্দশায় সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁর কাছে গিয়েই দ্বীন ইসলামের বিধিবিধান জেনে নিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় নারীরাও রাসুল (সা.)-এর কাছে তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মাসআলা জেনে নিতেন। মহানবী (সা.) তাদের সঙ্গে লজ্জাজনক মাসআলা বলার ক্ষেত্রে লাজুকতার কারণে শালীনতার পরিচয় দিতেন। খোলামেলাভাবে মাসআলা বর্ণনা করতেন না। অবশ্য দ্বীনের ক্ষতি হবে মনে করলে খোলামেলাভাবেই বলে দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, এক নারী রাসুল (সা.)-কে হায়েজের গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তাকে গোসলের নিয়ম বলে দিলেন যে, ‘এক টুকরা কস্তুরি লাগানো নেকড়া নিয়ে পবিত্রতা হাসিল করো।’ নারীটি বলল, ‘কীভাবে পবিত্রতা হাসিল করব?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তা দিয়ে পবিত্রতা হাসিল করো।’ নারীটি (তৃতীয়বার) বলল, ‘কীভাবে?’ রাসুল (সা.) লজ্জায় (মুখ ঢেকে) বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! তা দিয়ে তুমি পবিত্রতা হাসিল করো।’ আয়েশা (রা.) বলেন, তখন আমি তাকে টেনে আমার কাছে নিয়ে এলাম। এরপর বললাম, ‘তা দিয়ে রক্তের চিহ্ন বিশেষভাবে মুছে ফেল।’ (বুখারি : ৩১৪)
অনেক সাহাবি নবীজির লাজুক হওয়ার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। নবীজির আচার-আচরণে অনেক সময় লজ্জাবতী কুমারীর লাজুকতা পরিলক্ষিত হতো। মহানবী (সা.) এত লাজুক ছিলেন, পর্দানশিন কিশোরীর চেয়েও তার মধ্যে অধিক লজ্জাশীলতা দৃষ্টিগোচর হতো। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, পর্দার অন্তরালের কুমারীদের চেয়েও নবীজি (সা.) অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। যখন তিনি তাঁর কাছে অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন, তখন আমরা তাঁর চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম (বুখারি : ৬১০২)। যদি কখনো নবীজির কাছে কোনো সাহাবির ব্যাপারে কোনো ধরনের অভিযোগ আসত, তখন আভিজাত্য, ভদ্রতা, শালীনতা ও লজ্জাশীলতার কারণে মহানবী (সা.) সেই সাহাবির নাম উল্লেখ না করে ব্যাপকভাবে সব লোককে সে সম্পর্কে সতর্ক করে দিতেন। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে অন্য লোকেরাও সতর্ক হয়ে যেত। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-কে কোনো ব্যক্তির কোনো বিষয়ে জানানো হলে তিনি এভাবে বলতেন না, তার কী হলো যে, সে এ কথা বলে? বরং বলতেন, লোকজনের কী হলো যে, তারা এই এই বলে (আবু দাউদ : ৪৭৮৮)?
সময়ের আলো/আরএস/