সংসার ও সমাজে যেভাবে সুখ আসে

জুনাইদ সাঈদ

ইসলামের আলো

সংসার ও সমাজ গঠিত হয় অনেক মানুষের সমন্বয়ে। পরিবারে যেমন থাকে বিচিত্র মানুষের উপস্থিতি, তেমনি সমাজেও থাকে বহুরূপী মানুষের বসবাস।

2023-11-19T00:17:24+00:00
2023-11-19T00:17:24+00:00
 
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
সংসার ও সমাজে যেভাবে সুখ আসে
জুনাইদ সাঈদ
প্রকাশ: রোববার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৩, ১২:১৭ এএম 
সংসার ও সমাজে যেভাবে সুখ আসে
সংসার ও সমাজ গঠিত হয় অনেক মানুষের সমন্বয়ে। পরিবারে যেমন থাকে বিচিত্র মানুষের উপস্থিতি, তেমনি সমাজেও থাকে বহুরূপী মানুষের বসবাস। একটি সমাজে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বাস করে। তবে একসঙ্গে শুধু বসবাস করলেই সুখী সমাজ হয় না, সুখী হতে হলে আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা ও পরস্পরের প্রতি কর্তব্য-অধিকার আদায়ে ব্রতী হতে হয়। কিন্তু বর্তমানে সমাজে যেন এসবের কিছুই নেই। না আছে নৈতিকতা, না আছে মানবিকতা। উল্টো পরস্পরে দূরত্ব ও বিচ্ছেদের টানাপড়েন বিরাজ করে ঘুণে ধরা সমাজে। পাশের বাড়ির মানুষটি কেমন আছে? দুই বেলা খেতে পাচ্ছে কি না? এতটুকু খোঁজখবর নেওয়ার মতো সময়ও যেন আমাদের নেই! সমাজের নারীদের যেন কোনো মূল্যই নেই। নেই কোনো সম্মান অধিকার। নারী নির্যাতন ও উত্ত্যক্তকরণ প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত সর্বত্রই তাদের উত্ত্যক্ত ও নির্যাতন করা হচ্ছে। অথচ আমরাই নারী অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে মঞ্চ গরম করছি, বক্তব্য দিচ্ছি।

সম্পদ আর ক্ষমতার মোহে বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিছু মানুষ। দুর্বলদের প্রতি আঘাত, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার সংঘাত এতটাই প্রকট হচ্ছে, ‘মানবাধিকার’ শব্দটি এখন শুধু মুখের বুলি আওড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। গরিবের প্রতি স্বৈরাচারী বাড়ছে। গরিবের হক মেরে আকাশছোঁয়া ভবন আর সম্পদের পাহাড় গড়ছে কিছু অসাধু মানুষ। অথচ সেই গরিব মানুষটি দুই বেলা অন্ন জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। পেটের দায়ে যে ব্যক্তি চুরি করে, তার বিচার করতে আমরা মহাব্যস্ত। অথচ সমাজের প্রভাবশালীরা যখন ‘সাগরচুরি’ করে, তখন আমরা সেটা কৌশলে এড়িয়ে যাই। ক্ষুধার্ত পথশিশুরা সাহায্যের জন্য ছুটে এলে তাদের প্রতি আমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ ক্ষেপ থাকে না। একজন অসহায় রিকশাচালকের সঙ্গে পাঁচ টাকার জন্যও প্রচণ্ড দরকষাকষি করি। অথচ আমোদ-ফুর্তি আর বিলাসিতায় সেই আমরাই অঢেল অর্থকড়ি নষ্ট করি।

পাশের মানুষটি যদি যশ-খ্যাতি আর ধন-সম্পদে আমার চেয়ে বেড়ে যায়, তখনই আমরা হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠি। কীভাবে তাকে দমানো যায়, তার ক্ষতি ও হেয়প্রতিপন্ন করা যায়। সে নেশায় আমরা বুঁদ হয়ে পড়ি। অতি আধুনিকতার নামে আমরা অনেকেই নিজের শিকড় পর্যন্ত ভুলে যাই। যে মা-বাবা নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে অসহনীয় কষ্ট করে সন্তান মানুষ করেছেন, সাফল্য এনে দিয়েছেন; দিন শেষে তাদেরই আমরা বোঝা মনে করি। যাদের ছাড়া আমাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তাদের আমরা চরমভাবে অবহেলা করে বসি। সমাজে আজ বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আমরা বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগৎকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছি। নেট যেমন পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, সবকিছু সহজ করে দিয়েছে। নীতি-নৈতিকতাকেও তেমন শূন্যের কোঠায় পৌঁছে দিয়েছে। স্মার্টফোন হাতে পেয়ে আমরা সবার মধ্যে থেকেও সবাই যেন একা। তরুণ প্রজন্ম আজ সারাক্ষণ নেশাগ্রস্তের মতো হয়ে যাচ্ছে। সামাজিকতা  ও নৈতিকতা উপেক্ষা করে জীবনধ্বংসী ভিডিও গেম, পর্নোগ্রাফি আর অনলাইনের অন্ধকার জগতেই আমরা মেতে উঠছি। ফলে দিন দিন আমাদের পারিবারিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে। আমরা এক অনিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। জান-মাল, ইজ্জত-আবরু কোনো কিছুর নিরাপত্তা নেই। প্রতিনিয়ত নানা অঘটন ঘটছে। এমনকি স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, মা-বাবা সন্তানকে, ভাই ভাইকে, সন্তান মা-বাবাকে অবলীলায় হত্যা করছে। মানুষের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা যেন তলানিতে পৌঁছেছে। চারদিকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে, যেকোনো বিবেকনিষ্ঠ মানুষের রক্ত হিম হয়ে আসে। সামাজিক শৃঙ্খলা/ব্যবস্থাপনা কেন এভাবে ভেঙে পড়ছে? কেন সামাজিক পতন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে? এর কারণ একটাই, আমরা আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী আদর্শ ছেড়ে মানব রচিত আদর্শ আর সংস্কৃতির অন্ধ চর্চায় মেতে উঠেছি। আসল সুখ-শান্তির পথ ছেড়ে আমরা মরীচিকার পেছনে লাগামহীনভাবে ছুটে চলেছি। যার বাস্তব পরিণতি আমাদের বর্তমান সমাজচিত্র।

যেখানে শান্তি-মিল নেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে। সম্পর্ক নেই ভাই ভাইয়ের মধ্যে। দেখা-সাক্ষাৎ আর খোঁজখবর নেই আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। সৌহার্দ নেই প্রতিবেশীর প্রতি। সহানুভূতি নেই গরিব-অসহায়ের প্রতি। ভ্রাতৃত্ববোধ নেই মুসলমান ভাইয়ের প্রতি। এমনকি মানবতাবোধ নেই অমুসলিমদের প্রতি। আধুনিকতার ফলে সমাজ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, নানাভাবে তেমন পিছিয়েও যাচ্ছে। একদিকে বস্তুবাদের উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে, অন্যদিকে মানবতা-নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটছে। জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে, মানবতাবিবর্জিত তেমন যান্ত্রিক মানুষে পরিণত করে তুলছে আমাদের। হতাশা, অস্থিরতা আর অশান্তি সদা আমাদের হৃদয় কুরে কুরে খাচ্ছে। একচিলতে শান্তির জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠছে। কোথাও শান্তি না পেয়ে অবশেষে সুইসাইডের পথ বেছে নিচ্ছে।

সমাজের এ বিভীষিকাময় অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খোদাপ্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে একমাত্র সংবিধান হিসেবে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দেওয়া এবং তাঁর প্রেরিত রাসুলের অনুপম চরিত্রকে একমাত্র আদর্শ হিসেবে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা আর জীবনের পরতে পরতে তা বাস্তবায়নে ব্রতী হওয়া। যদি ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারি, তা হলে জান-মাল, ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আমরা সমাজে বাস করতে পারব। যেখানে প্রাণ খুলে নিশ্বাস নিতে পারব। কোনো ভয়ভীতি, শঙ্কা আর অরাজকতা বিরাজ করবে না। তখন একজন নারী দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত নির্ভয়ে একা সফর করতে পারবে; তার মান-সম্মান আর সম্ভ্রমহানির কোনো ভয় থাকবে না। একজন পথিক সঙ্গে অর্থ-সম্পদ নিয়ে দিনে-রাতে যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারবে; তার জানমালের কোনো শঙ্কা থাকবে না। একজন গরিব-অসহায় সমাজে আত্মসম্মান নিয়ে বসবাস করবে; কেউ তাকে অপমান আর তুচ্ছ জ্ঞান করবে না। সমাজে শান্তি আর শান্তি বিরাজ করবে। মর্ত্যলোকে স্বর্গীয় শান্তি নেমে আসবে। এমন সুখী সমাজ বিনির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আসুন, সুখী সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে আমরা রাসুলের রেখে যাওয়া সেই আদর্শ ধারাবাহিকভাবে জানি এবং জীবনে বাস্তবায়ন করি।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: