অর্থনৈতিক মূলসূচক নিয়ন্ত্রণে রাখামির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার
বিগত ২০২৩ সালে যেসব সমস্যা ছিল তা নতুনভাবে চিহ্নিত করা। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি। কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তার জন্য সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেটাই আমার প্রত্যাশা। আমাদের যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেই চ্যালেঞ্জগুলো শক্তহাতে মোকাবিলা করা। এর মধ্যে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিগত বছরজুড়ে ছিল ডলার সংকট। এই ডলার সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ করা যায় তার একটি পথ অবলম্বন করা।
আমাদের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যেন বৈধ চ্যানেল আসে তার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তৈরি করা। প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এই ঋণের জন্য বেসরকারি ঋণ প্রবাহ অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। সুতারং বাজেট ঘাটতি যেন রাজস্ব বৃদ্ধি করে মেটানো যায় তার পদক্ষেপ নিতে হবে। টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। নতুন ২০২৪ সালের প্রত্যাশা হচ্ছে, সরকারকে সামষ্টিক অর্থনীতকে স্থিতিশীল রাখা। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুরে চলে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি যেন কোনোভাবেই উসকে না যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে আমার প্রত্যাশা।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সম্মানীয় ফেলো, সিপিডি
আমার প্রত্যাশা হচ্ছে, অর্থনীতির মূল সূচকগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ অর্থনীতিতে যেসব দুর্বল দিক রয়েছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি। এর পাশাপাশি রয়েছে সার্বিক দুর্বল বৈদেশিক লেনদেন। সুদের হারে ভারসাম্য বজায় রাখা। এসব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে। মানুষ যেন তাদের জীবন মান খুঁজে পায়। জীবন মান কীভাবে উন্নত করা হবে তা খতিয়ে দেখতে হবে। একইসঙ্গে তার আনুষঙ্গিক প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে আমার প্রত্যাশা।
মো. মাহবুবুল আলম
প্রেসিডেন্ট, এফবিসিসিআই
নতুন বছরের প্রত্যাশা হচ্ছে, বিগত দিনের সব আবর্জনা দূর করে সামনে এগিয়ে চলা। বিগত ২০২৩ সালে অর্থনীতিতে যেমন ছিল মূল্যস্ফীতি। সেই মূল্যস্ফীতি যেন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তার জন্য সবকিছু ব্যবস্থা করা। অবশ্য এই ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা থাকলেও, ব্যবসায়ী সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কীভাবে এগিয়ে আসবে তার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। আমরা এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের মূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে তার মনিটর করা ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা । এ ক্ষেত্রে সরকারের অবশ্যই সহায়তা প্রয়োজন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেন কোনো পণ্যের মূল্য রাতারাতি বৃদ্ধি না পায় তার নজরদারি আরও কঠোর করা প্রয়োজন। অর্থনীতি যদি ভালো থাকে তা হলে সাধারণ মানুষ ভালো থাকবে, সে প্রত্যাশা রইল। বিগত ২০২৩ সালে যেমন ডলার সংকট ছিল, সামনের বছরে যেন এই সংকট আর না থাকে তার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ডলার সংকটের কারণে যেন নিত্যপণ্যের আমদানি বন্ধ না থাকে সে ব্যবস্থা আগেভাগে নেবে, সে প্রত্যাশা রইল। এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার প্রত্যাশা হচ্ছে, বিগত দিনগুলোতে আমাদের অন্তরায়গুলো দ্রুত চিহ্নিত করে তা সংশ্লিষ্টদের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নতুন বছর হোক নতুনভাবে সমবেতভাবে পথ চলা। যে পথ চলায় কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। পুরোনো দিনের সমস্যাগুলো সমাধান করা। নতুন সরকারকে সার্বিকভাবে সবার সহযোগিতা করা হোক আমার নতুন বছরের প্রত্যাশা।
ড. জাহিদ হোসেন
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের আবাসিক সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
নতুন বছর ২০২৪ সালে একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমন রয়েছে প্রত্যাশা। নতুন বছরে উত্তরাধিকার ২০২৩ সালে বেশ কিছু সমস্যা থাকলেও, বড় চ্যালেঞ্জ হবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীল পুনর্বহাল করা। উত্তরাধিকার সূত্রে এই অবস্থার মোকাবিলার জন্য নীতি নির্ধারকরা যে পথে হেঁটে এসেছেন সেগুলো কিন্তু নতুন বছরে চলে আসছে। বিশেষ করে মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সুদের হার বাজারভিত্তিক করা বিষয়টি নতুন বছরের জন্য কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। তবে শেষ হয়ে যাওয়া ২০২৩ সালে যে কৌশল গ্রহণ করা হয়নি তা নয়। গ্রহণ করা হলেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যায়নি। যে কারণে নতুন বছরে কৌশলের পরির্বতনের প্রয়োজন হবে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের জন্য সুখবর রয়েছে। আর সেই সুখবরটি হচ্ছে, বিশ^ অর্থনীতিতে যে আশঙ্কা ছিল, মন্দার যে আশঙ্কা ছিল সেটি এখন পরিবর্তন হয়েছে। যেভাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল সেটা হয়নি। ২০২৪ সালে বিশ^ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এরপরও বলতে হয়, আর্থিক খাতে যে ভঙ্গুরতা, সুশাসনের অভাব, অসদাচরণকে প্রশয় দেওয়া হয়েছে তা যেন নতুন বছরে না থাকে, সে প্রত্যাশা করতে পারি। তবে এসব পরিবর্তনের জন্য যে ধরনের কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন তা কতটুকু আগের চেয়ে পরিবর্তন হয়েছে তা দেখার বিষয়। কারণ ২০২৩ সালে ব্যাংকিং খাতে যে ধরনের আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। আবার কিছু ব্যাংকের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে তা যেন পুনর্ব্যক্ত না ঘটে। মোটকথা আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। একইভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো বিষয় যেন একইভাবে প্রয়োগ না হয়। নতুন বছরে বৈদেশিক ঋণ থেকে বের হয়ে বিনিয়োগে জোগান বাড়ানো প্রয়োজন। ২০২৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনে উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধন আনা হয়েছে। তবে এ নিয়ে আরও কাজ করার সুযোগ রয়ে গেছে। আশা করব ২০২৪ সালে আরও যেন কৌশলী হওয়া যায়। ঋণ খেলাপিদের জন্য আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে ২০২৪ সালের জন্য নতুন কৌশল। এ ছাড়াও তেল, গ্যাস, সারের মূল্য যেন স্থিতিশীল রাখা যায় সে দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার কৌশল নিতে হবে। মোটকথা নীতি নির্ধারক যেন যে পথে হেঁটেছেন সেই পথে হাঁটার ক্ষেত্রে নতুন কৌশল অবলম্বন করেন, সে প্রত্যাশা নতুন বছরের জন্য।
ড. বিনায়ক সেন
মহাপরিচালক বিআইডিএস
অনেকেই বলতে পারেন নতুন বছরের প্রত্যাশা। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার স্বপ্ন। বিগত দিনে দেশের ভেতরে যে অর্থনৈতিক টানাপোড়ন রয়েছে, সেই টানাপোড়ন যেন আর না থাকে। কোভিড চলে গেছে। কিন্তু কোভিডের পর যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ তা অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এরপরও আমার স্বপ্ন, কোভিডের আগের অবস্থায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা যেন বজায় থাকে। দ্রব্যমূল্য যেন কমে আসতে শুরু করে। হয়তো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এখনও কিছুটা সমস্যা রয়ে গেছে। আমি আশা করব, নতুন ২০২৪ সাল এই দুটো খাতে আরও মনোযোগ দেওয়া হবে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কবে যে শেষ হবে তা কেউ বলতে পারছে না। এই যুদ্ধের প্রভাব কমবেশি সব দেশেই পড়ছে। আগামীতেও এর প্রভাব হয়তো থেকেই যাবে। এর মধ্যে আবার গাজা-ফিলিস্তিন যুদ্ধ। এটি হয়তো স্থানীয়ভাবে প্রভাব ফেলবে। তাই বলে এই যুদ্ধকে আমাদের দেশে প্রভাবকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমাদের স্বস্তির জায়গা হচ্ছে, আইএমএফ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। তারা মূলত সেই দেশকে সহায়তা করে, যে দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। তবে নতুন বছরে ব্যাংকগুলোকে আরও সংস্কারের পথে যেতে হবে। ইতিমধ্যে অবশ্য বেশ কিছু পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে তা ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে। নতুন বছরে বাইরের নিষেধাজ্ঞাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ নীতি কাঠামোতে রাজনৈতিক পিছুটান কতটা থাকবে তা নতুন অর্থবছরে বোঝা যাবে। এরপরও আমার প্রত্যাশা, দেশে একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসুক। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অর্থনৈতিক কাঠামোতে শক্তি আসবে। বিগত বছরে যেসব সমস্যা নতুন বছরে ধারাবাহিকভাবে প্রবেশ করবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ দেখতে চাই নতুন বছরে।
সময়ের আলো/আরএস/