প্রকাশ: শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০, ১১:১৫ পিএম
হঠাৎ হঠাৎ
গোলাগুলির শব্দ। চারদিকে শুরু হয় চিৎকার এবং শোরগোল। সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে
ঝোপে-ঝাড়ে, ফসলের মাঠে এবং বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। কেউ কেউ পুকুরে
কচুরিপানার আড়ালে পালিয়ে থাকে। পাকিস্তানি মিলিটারি যাকে ইচ্ছা তাকে গুলি
করে। হোক সে শিশু, যুবক, নারী কিংবা বৃদ্ধা। কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়
না। বনির দাদা শান্টু মিয়া বৃদ্ধ মানুষ, দৌড়াতে পারেন না। তাই তিনি ঘরের
কোণে বড় একটা গর্ত করে রেখেছেন। মিলিটারি আসার খবর শুনলেই গর্তে লুকিয়ে
পড়েন। বাড়ির অন্যরা পালানোর সময় গর্তের ওপর খড়কুটা দিয়ে যায়। আবার মিলিটারি
চলে গেলে বেরিয়ে আসেন। বনির চাচা ঝন্টু মিয়া চালাক লোক। তিনি কষ্ট করে
দৌড়াতে রাজি নন। তাই মিলিটারি আসার খবর পেলেই পুকুরপাড়ের নারিকেল গাছে উঠে
বসে থাকেন। মিলিটারি চলে গেলে আবার নেমে আসেন। দিন বা রাত যখনই পাকিস্তানি
মিলিটারি আসুক সবাই ঘর-বাড়ি রেখে প্রাণ নিয়ে পালায়। শীতের সময় কষ্ট বেশি
হয়। মিলিটারি এলে শীতের কাপড়টা সঙ্গে নেওয়ার সময় থাকে না। পাকিস্তানি
মিলিটারিরা মানুষ পেলে মানুষ মারে, নইলে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। তখন খোলা
আকাশের নিচে থাকতে হয়।
সেদিন সকালে বনি যাচ্ছিল তার বাড়ি থেকে এক মাইল
দূরে পাশের গ্রামে তার বন্ধু মন্টিকে দেখতে। বনির বাড়ি ফুলবাড়ী গ্রামে আর
পাইককান্দি গ্রামে মন্টিদের বাড়ি। তারা দুজনই পাইককান্দি স্কুলে চতুর্থ
শ্রেণিতে পড়ে। সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তানি মিলিটারিরা মন্টিদের ঘরবাড়ি
পুড়িয়ে দিয়েছে। বনি সকালবেলা মন্টিদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। কিন্তু
মন্টিদের বাড়ির কাছাকাছি যেতেই শুনতে পেল হইহল্লা এবং মিছিলের আওয়াজ। সে কী
করবে বুঝে উঠতে পারছে না। বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে তাই ফিরতে সময়
লাগবে। আবার সামনেও যাওয়া যাবে না। পাকিস্তানি সেনারা হয়তো এবার তার
প্রাণটাও নেবে। হঠাৎ মনে পড়ল তার ফুপুবাড়ির কথা। সেখান থেকে ফুপুবাড়ি বেশি
দূরে নয়। বড় রাস্তা ব্রিজের পুবপাশের বাড়িটা তার ফুপুদের। তাই সোজা সেদিকে
দৌড় শুরু করল। কিন্তু সেখানে এলো আরও বিপদ। ফুপুবাড়িতে পৌঁছানোর আগেই
শুনতে পেল আরেকটা মিছিলের আওয়াজ। দিশেহারা বনি, কিন্তু মিলিটারির হাত থেকে
বাঁচতে তো হবেই। এবার দৌড় শুরু করল মাঠের ভেতর দিয়ে। মাঠ ভরা সরিষার ক্ষেত,
তার মধ্য দিয়েই দৌড়াচ্ছে বনি। দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবুও
হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ সে তার মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেল। এবার একটু
থামল বনি। তার মা তাকে ডাকছেÑ বাবা বনি, আমার সোনা মানিক তুই ফিরে আয়। আর
ভয় নেই। এটা মিলিটারি আসার শব্দ না। এটা বিজয়ের শব্দ, খুশির আওয়াজ। দেশ আজ
স্বাধীন। বনি তার মায়ের কাছে এলো। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।
বনির
মা তামান্না বেগমও মিলিছের শব্দ শুনেছিলেন। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন আজকেও
পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছে। এজন্য তার মা বনিকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। কিন্তু
মাঝপথে গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা স্বপন চাচার কাছ থেকে জানতে পারেন এটা
পাকিস্তানি মিলিটারি আসার শব্দ না। এটা বিজয় মিছিলের অওয়াজ। দেশ আজ
শত্রæমুক্ত হয়েছে। বনির মা বললেন, চল বাবা মিছিলে চল, বিজয়ের আনন্দে উল্লাস
কর।
মিছিলটা তখন বুলু কাকার চায়ের দোকানের সামনে। বনি দেখল তার সেই
বন্ধু মন্টি মিছিলের সামনে। জয় বাংলা বলে গলা ফাটিয়ে সেøাগান দিচ্ছে।
গ্রামের
নারী-পুরুষ সবাই মিছিলে এসেছে। সবার মনে আজ খুশির বন্যা। কেউ
নাচছে, কেউ গাইছে। সবাই আনন্দ করছে। বনিও জয় বাংলা বলতে বলতে বিজয় মিছিলে
যোগ দিল।