নীরব অস্ত্র স্ক্রিনশট, বাড়ছে জটিলতা

কাব্য সাহা

সম্পাদকীয়

স্মার্ট যুগে আনস্মার্ট থাকাটা প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার। মানুষ সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়ে সমাজের সঙ্গে কিংবা দেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে

2021-08-05T08:37:42+00:00
2021-08-05T08:37:42+00:00
 
  সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬,
২৫ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬
সম্পাদকীয়
নীরব অস্ত্র স্ক্রিনশট, বাড়ছে জটিলতা
কাব্য সাহা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১, ৮:৩৭ এএম 
স্মার্ট যুগে আনস্মার্ট থাকাটা প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার। মানুষ সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়ে সমাজের সঙ্গে কিংবা দেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলে। পরিবর্তনই মানুষের ধর্ম আর সেখানে যদি হয় উন্নত প্রযুক্তির স্পর্শ, তাহলে মানুষের বদলে যাওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। কারণ পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে স্মার্ট যুগে আনস্মার্ট থাকাটা বড্ড বেমানান। তাই প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনীর স্বাদ পেতে মানুষ জ্ঞানবশত কিংবা অজ্ঞানবশত অনেক কিছুই ব্যবহার করছে। এখন একটি স্মার্টফোন হাতে থাকলে গোটা বিশ্বটাকে হাতের মুঠোয় রাখা যায়। সেই সুবাদেই প্রযুক্তির উদ্ভাবনে মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারে একদিকে আশীর্বাদ বয়ে আনছে যেমন- হ্রাস পেয়েছে শারীরিক পরিশ্রম, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা যেমন- মানসিক বিকৃতি।

স্মার্ট যুগে মানুষের মুখের চেয়ে হাতের তথা আঙুলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। আগের মানুষ বার্তা আদান-প্রদানে নানা মাধ্যম যেমন- চিঠিপত্র, পায়রা কিংবা মানুষের নিজেদেরই ব্যবহার করত। সেই তথ্য আদান-প্রদানে ছিল অপেক্ষার আকাক্সক্ষা। কখনও আনন্দের খবর এসেছে শব্দে চারদিকে সারা পড়ে যেত, আবার কখনও বিষাদের বার্তায় আকাশ ভারী হতো। আগের যুগে মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দিত বা পৌঁছে দিত। প্রথমে এক কান থেকে পাঁচ কান, ধীরে ধীরে মনের মাধুর্য মিশিয়ে একটি অঞ্চলের সবার মাঝেই সেটি ছড়িয়ে পড়ত। এই তথ্য আদান-প্রদানে একরকম শান্তি ছিল ও সুস্থ বিনোদনের অংশ ছিল। কারণ সেখানে ছিল হাসি-ঠাট্টা, একে অপরের সঙ্গে আন্তরিকতা, ভালোবাসা ইত্যাদি। কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে সেসব প্রায় হারিয়ে গেছে প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবনের ছোঁয়াতে। বলছি স্মার্টফোনের ব্যবহারের কথা। স্মার্টফোন প্রজন্ম মুখে বলে কম, আঙুলের ব্যবহার করে বেশি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কম, ভার্চুয়ালি সমালোচনা করে বেশি। তাহলে কীভাবে? স্মার্টফোনের একটি বাটন চাপলেই পুরো স্ক্রিনের চিত্র ধারণ করে নেওয়া যায়, এই ফিচারকেই বলে স্ক্রিনশট। আর এই স্ক্রিনশট ফিচার ব্যবহার করে এই প্রজন্ম মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথা ব্যক্তিপর্যায়ে।

বন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথনের একটি স্ক্রিনশট অন্যকিছু বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে এক পৈশাচিক রকমের আনন্দ অনুভব হয় এক শ্রেণির মানুষের কিন্তু এটা নিশ্চয়ই আনন্দের বিষয় নয় কিংবা সুস্থ বিনোদনও নয়। আর যে এমন কাজটি করছে সে কি প্রকৃত অর্থে সুস্থ মানসিকতার অধিকারী? একজনের গোপন তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে বিকৃত মানসিকতার লোকটি সাময়িক শান্তি অনুভব করলেও এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, যা কল্পনার বাইরে। এরূপ অনেক ঘটনার ফলে দিনে দিনে পারিবারিক কলহ বাড়ছে, এমনকি বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটছে। মাত্র একটি স্ক্রিনশটই যথেষ্ট বড় কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে। ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্থিরচিত্র বা স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া শুধু যে অন্যের গোপনীয়তা হানি করে তা নয়, বরং যে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি তথা অসুস্থ মানসিকতারই প্রকাশ পায়।

একটু গভীর দৃষ্টিতে ভেবে দেখবেন একজনের সঙ্গে অপরজনের সোশ্যাল মিডিয়ায় বা মেসেজের মাধ্যমে যে কথা হয় সেইটা নিতান্তই দুজনের ব্যক্তিগত আলোচনা। সেখানে থাকতে পারে মতামত বিনিময়, প্রতিক্রিয়া, স্পেসিফিক বিষয়ে মন্তব্য, ভাবের আদান-প্রদান ইত্যাদি। এই ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বাইরের সবার জানার অধিকার বা প্রয়োজনীয়তা আছে কি? অথবা ভিন্নভাবে চিন্তা করুন। একটা গ্রুপে বেশ কিছু নিকটবন্ধু মিলে আলোচনা বা সমালোচনা করা হয়ে থাকে। এখন এই গ্রুপে আলোচনার তথ্যচিত্র বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা প্রকাশ করাটা সমীচীন কিনা? এখানে বন্ধুত্বের স্থানটা প্রশ্নবিদ্ধ হয় কিনা ভেবে দেখুন।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির নতুন অস্ত্র হয়ে উঠছে স্ক্রিনশট ফিচার। যার মাধ্যমে ছোট ছোট বিষয় থেকে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার। ছিন্ন হয় সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়। আলাদা একটি বিষয় উদাহরণ স্বরূপ বলা যাক। অনেক শিক্ষকদের পড়ানোর ধরন অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে ভালো লাগে না। এখন সেটি সবার বা শিক্ষকের সামনে বলাটা একদম বেমানান এবং রীতিমতো আদবহীনতার পরিচয়। তো এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য অবশ্যই বিশ্বস্ত কারও প্রয়োজন। এখন ভার্চুয়ালি বন্ধুদের মধ্যে বিশ্বস্ততা রেখে কথোপকথন হলো কিন্তু দেখা গেল কথোপকথনের আগে-পরের অংশ বাদ দিয়ে কেউ বিশেষ কোনো পয়েন্ট ফোকাস করে সেটি শিক্ষকদের বা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল তাহলে বিশ^স্ততার কী প্রকাশ পায়? অপরপক্ষের বিষয়টি নজরে আসাতেই শুরুতে মনে স্পর্শ করাটাই স্বাভাবিক কিন্তু পরক্ষণেই তার ধারণা বদলে যায় কারণ যেই মানুষটি হেয় কাজটি করেছে তিনি বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী বলেই তার দ্বারা এমনটা সম্ভব হয়েছে। যা একপ্রকার বেয়াদবি এবং নিজের সম্মান হানিকর ব্যাপার। এখানে দুটি বিষয় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথমটি গ্রুপের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়াতে মানুষের গোপনীয়তার লঙ্ঘন হয়েছে। দ্বিতীয়টি ভার্চুয়াল বিশ্বস্ত বন্ধু বা বন্ধুমহল ভাবা হয়েছে প্রকৃত অর্থে তারা কেউই শুভাকাক্সিক্ষ নয়। বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে মাথায় রাখাটা জরুরি।

আবার প্রেম-ভালোবাসার বিষয়গুলোয় আমরা বেশ সংবেদনশীল। যখন প্রেমিক-প্রেমিকা দুজনের মধ্যে সম্পর্কের শুরুটা হয় তখন উভয়ই প্রেমালাপ করে থাকে আর এইটাই স্বাভাবিক কিন্তু পরবর্তীকালে সম্পর্কে ফাটল ধরলে শুরু হয় প্রতিশোধ নেওয়ার মতো জঘন্য ব্যাপার। তখন হাতিয়ার হয় প্রেমালাপ ঘটিত মেসেজের স্ক্রিনশট। যার ফলে একটি পরিবারের শুধু সম্পর্কই নষ্ট হয় না, সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা। প্রেমালাপের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া বা সংসার ভেঙে দেওয়াটা কোনো প্রতিশোধ নয় বরং করুচিপূর্ণ ও বিকারগ্রস্ত মানসিকতার প্রকাশ। ভালোবাসা আমাদের সম্মান করতে শেখায় না? একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যদি না থাকে তাহলে সেটা কিসের ভালোবাসা? সম্পর্কের স্থায়িত্ব না হলেও ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তাহলে অপরপক্ষের প্রতি সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করাই কি কাম্য নয়? ভালোবাসা শুধু আবেগ শেখায়, বিবেক জাগ্রত করে না?

আমাদের এই স্ক্রিনশট সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নয়তো ভার্চুয়াল অস্ত্রের কাছে মানুষ দিন দিন জিম্মি হয়ে পড়বে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গঠনে এর ব্যাপাক প্রভাব পড়বে। সুতরাং আমাদের সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার প্রয়োজন। ব্যক্তিগত মানে ব্যক্তিগত সেটি জনসাধারণের জন্য নয়, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই সময়ে বিষয়টি সচেতনতার সঙ্গে দেখতে হবে। একজনের বোকামির বলিদান যেন অন্যজন না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। একটি গ্রুপের আলোচনা শুধু গ্রুপের মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, অন্য কোথাও নয়। এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যুগে বিনোদনের জন্য যথেষ্ট মাধ্যম বা প্লাটফর্ম রয়েছে। যেখানে বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষার বিষয়গুলো রয়েছে। আমাদের এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তুলতে হবে। আমরা অন্যের জীবন দুর্বিষহ করে তুলে পৈশাচিক রকমের আনন্দ অনুভবের চেষ্টা করি। 

এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সম্মানের চোখে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বাইরের দেশগুলোয় যেমন যুক্তরাজ্যে কারও অনুমতি ছাড়া কোনো স্ন্যাপচ্যাটের স্ক্রিনশট নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে মূল লেখক চাইলে অপরাধীকে কারাগারে পাঠাতে পারেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যই এমন আইন। সুতরাং অনুমতি ছাড়া কিছু শেয়ার করা যেহেতু একপ্রকার ক্রাইম সেহেতু অন্যের তথ্য সংরক্ষণ করাটাই একজন নাগরিকের কর্তব্য। তা ছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু লেখার আগে কিংবা কোনো ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ারের আগে ভেবে নিন। কারণ একবার প্রকাশ হলে সেটি একপ্রকার প্রমাণপত্র হিসেবে আপনার বিরুদ্ধে কাজ করবে। নিজের পাতা জালে নিজেকে জড়িয়ে যেতে হবে। কারণ যে বা যারা স্ক্রিনশট নেওয়ার কাজ করবে তারা মানুষকে আগে-পরের বিষয়গুলো থেকে দূরে রেখে মূল পয়েন্টকে উপস্থাপন করবে। এজন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্বিক সচেতন থাকাটা জরুরি। যেকোনো খারাপ পরিস্থিতির সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া নয় বরং পরিবার বা বিশ^স্ত কাউকে সরাসরি শেয়ার করুন। আমাদের সবার উচিত প্রযুক্তির আশীর্বাদকে ব্যবহার করা। সামাজিকতা এবং আন্তরিকতা বৃদ্ধিতে একে অপরের সঙ্গে ভার্চুয়ালি নয় সরাসরি যোগাযোগ করুন। আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পরিবেশ উপহার দিন।

     কাব্য সাহা
     শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Advertisement
Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: