প্রশ্ন: বিশ্বের শীর্ষ ৪০ জন মোবাইল সাংবাদিকের একজন আপনি, বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?
জামিল: গত ২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক জার্নালিজম ডট সিও ডট ইউকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সেরা ৪০ জন মোবাইল সাংবাদিক, প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের মধ্যে আমাকে এবং সাব্বির আহমেদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিসন্দেহে এটি বড় অর্জন। তবে এখানেই থেমে যেতে চাই না। নিজের কাজের মাধ্যমে আরও ভালো কিছু করতে চাই।
প্রশ্ন: আপনি কিভাবে মোবাইল সাংবাদিকতায় এলেন?
জামিল: আমি ২০০৬ সালে সাংবাদিকতায় পড়াশুনা করতে যাই রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর পিপল ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে। এরপর ২০০৮-০৯ এর দিকে আমি একটি ইউটিউব চ্যানেল করি এবং সেখানে মোবাইল ফোন দিয়ে মস্কোর বাংলাদেশ কমিউনিটির যারা আছেন তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি এবং ভিডিও করে আপলোড করি। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও করার প্রতি আমার একটি তাড়না বা শখ তৈরি হয়। যেহেতু আমি সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলাম সে কারণে বরাবরই নিউজ সম্পর্কে আগে থেকেই আমার একটা ধারণা ছিলো। পরবর্তীতে যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারে থিসিস লেখার কাজে ব্যাস্ত হই, তখন নিউ মিডিয়া এবং অনলাইন জার্নালিজম এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং আমি জানতে চাই শিখতে চাই এটির ভবিষৎ কি? সেখান থেকে আগ্রহ ও চর্চার শুরু। মাস্টার্স প্রোগ্রামে এসেই মুলতঃ আমি মোবাইল সাংবাদিকতায় পরিচিতি পায় ২০১৩ সালের দিকে। ২০১৫ সালে যখন পিএইচডিতে অধ্যায়নরত ছিলাম তখন আমি খোজ পাই আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিংয়ে বিশ্বের প্রথম মোবাইল জার্নালিজমে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হবে, এবং সেখানে এক ছাদের নিচে সিএন.এন, আল জাজিরা, বিবিসি, এরকম প্রতিষ্ঠানের সাংবদিকরা আসবেন এবং মোবাইল জার্নালিজম নিয়ে দুইদিন আলোচনা করবেন। সেখানে একমাত্র বাংলাদেশী হিসাবে আমি যাওয়ার সুযোগ পাই। সেখান থেকে আমি তাদের কাছ থেকে মোবইল জার্নালিজম নিয়ে যে বিষয় গুলো সম্পর্কে জানতে পারি। বিশেষ করে মোবাইল জার্নালিজমে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি আয়ার ল্যান্ডের গ্লেন মুলাচি, অস্ট্রোলিয়ার ইবোব্রুম, বিবিসি কলেজ অব জার্নলিজমের ট্রেইনার মার্ক স্যাটলির সাথে কথা বলে আমি মোবাইল জার্নালিজম নিয়ে বেসিক ধারনাগুলো সুক্ষভাবে রপ্ত করি। পরে আমি নিজ উদ্দোগে বিভিন্ন অনলাইন থেকে কিংবা বই পড়ে নিজেকে তৈরি করি। এটিই আমার মোবাইল জার্নালিজমের আসার ঘটনা।
প্রশ্ন: সারা বিশ্বে যখন মোবাইল জার্নার্লিজমকে বিশেষ গুরুত দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও কেনো বিষয়টি অবহেলিত?
জামিল: দেখেন গুরুত্ব যে একেবারে দেওয়া হচ্ছেন না তা কিন্তু নয়। যেভাবে আমরা চাচ্ছি, যারা মোবাইল সাংবাদিকতার সাথে অনেক দিন ধরে পরিচিত বা কাজ করছেন তাদের চাওয়াটা হচ্ছে এই সাংবাদিকতা আরেকটু খোলামেলাভাবে র্চচা করা হোক। শুধু মাত্র ব্যাক্তি কেন্দ্রীক নয়, এটি প্রতিষ্ঠানিক রূপ পাক। সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমকে যে মোবাইল সাংবাদিকতা চর্চা করতে হবে, এ ধরনের কোনো দিক আহ্বান করা হচ্ছে না। যারা এটা নিয়ে গবেষণা করছে তারা ব্যাক্তি উদ্ধেগে করছে। আর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণ হিসাবে যদি বলি তাহলে বলতে হবে, মোবাইল জার্নালিজম নিয়ে জানা শুনার একটু ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া দক্ষতার অভাব, এবং এই সাংবিদিকতা করতে যে ইনস্ট্রমেন্ট বা টুলস দরকার সেগুলো সহজলভ্য না হওয়ায় কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন ইনস্ট্রমেন্টের বিষয়টি বাংলাদেশে অনেকটাই নাগালের মধ্যে রয়েছে।
প্রশ্ন: মোজো অর্থাৎ একজন মোবাইল সাংবাদিককে কোন বিষয়ের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?
জামিল: সাংবাদিকতার ‘কোর স্কিল’ সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি কোন বিষয়ে লাইভ করা যাবে, কোন বিষয়ে যাবে না- এ সম্পর্কে একটু জানাশোনা থাকতে হবে। এরপর তাকে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিভিন্ন প্লাটফর্মের মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ বৃদ্ধির সক্ষমতা থাকতে হবে। পাশাপাশি লাইভ করার জন্য সকল ইনস্ট্রমেন্ট ঠিকঠাক করে ফিল্ডে যেতে হবে।
প্রশ্ন: অনেক সময় লাইভে দর্শক ভুল তথ্য দেয়, এটির সমাধান কী?
জামিল: কোন দর্শক যদি লাইভে ভুল তথ্য দিয়ে থাকে সেক্ষত্রে সঠিক তথ্যটি নিজ থেকে সংশোধন করে দিতে হবে। আর সে জন্য লাইভ করার সময় দর্শক কি বলছে এটি ভালো করে নিজেকে শুনতে হবে। পাশাপাশি যে বিষয় নিয়ে লাইভ করা হয় সে বিষয়টি সম্পর্কে মোবাইল জার্নালিস্টকে একটু পড়ালেখা করতে হবে।
প্রশ্ন: বিশ্বের অন্যান্য স্থানে মোবাইল জার্নালিস্টদেরকে কেমন চোঁখে দেখা হয়?
জামিল: সারাবিশ্বে মোবাইল জার্নালিস্ট বা টেলিভিশন সাংবাদিকদের ভিন্নচোখে দেখা হয় না। সেখানে দেখা হয় কাজের মান। কেউ এমনটি কখনো বলে না, ‘এই স্টোরিটা মোবইল দিয়ে ভিডিও করা, না আলাদাভাবে ক্যামেরা দিয়ে করা’। বাংলাদেশে যেহেতু মোবাইল দিয়ে কোন বড় প্রোগ্রাম কাভারেজ তথা মোবাইল দিয়ে কারো সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রচলন এখনো শুরু হয় নি। সুতারাং আমাদের দেশে মোবাইল জার্নালিস্টরা বিদেশের মত এই সুবিধাটি পাচ্ছে না।
প্রশ্ন: যেখানে টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়া জনপ্রিয় গণমাধ্যম হিসাবে সারাবিশ্বে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে মোবাইল জার্নালিস্টদের ভবিষ্যৎ কি?
জামিল: যেহেতু বিশ্বে সকল মিডিয়া এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে। আমি মনে করি, আগামীতে সকল গণমাধ্যম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় মাল্টিমিডিয়া সম্পর্কে যারা জানে তাদের বেশি অগ্রাধিকার দেবে। আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে মোবাইল জার্নালিস্টরা গণমাধ্যমে চাকুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে এগিয়ে থাকবে। কারণ একজন মোবাইল জার্নালিস্ট গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম উভয় বিষয় সম্পর্কেই সম্যক ধারণা রাখে। তাই আগামীতে মোবাইল জার্নালিস্টদের সম্ভবনা অনেক।
প্রশ্ন: যারা নতুন করে মোবাইল জার্নালিজম বেছে নিচ্ছেন তাদের জন্য আপানার বার্তা কি?
জামিল: যদি মোবাইল সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাহলে প্রথমে আপনাকে দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণের পরিবর্তন করতে হবে। এই দুটি বিষয়কে এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যে, আপনি পারবেন আপনার হাতের কাছে ফোনটি দিয়ে সাংবাদিকতা করতে। এই অস্থাটি নিজেদের মধ্যে থাকতে হবে। এবং আপনার কাছে আইফোন নেই, স্যামসাং ফোন নেই তাই আপনি পারবেন না; এই চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। কারণ এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভূল। ডিভাইস কোন বিষয় নয়। মোটকথা হাতের কাছে থাকা ফোন দিয়েই মোবাইল জার্নালিজম করা যাবে এই মনোভাবটি নিজের মধ্যে তৈরি করতে হবে। এরপরের কাজ হচ্ছে শেখা, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন অনলাইনের ভিডিও দেখে, বই পড়ে, সোশাল জার্নালিজমের ম্যানুয়াল সম্পর্কে জানতে হবে। এককথায় একটি ফোন, ভালো সাউন্ডের জন্য একটি রেকর্ডার, একটি ট্রাইপোড এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি মোবাইল জার্নালিজম নিয়ে জানাশুনা থাকলেই সে এই পেশায় ভালো কিছু করতে পারবে বলে মনে করি।
/এসএম