আধুনিক যুগে আধুনিক একটি শব্দ ‘বৃদ্ধাশ্রম’। শব্দটি আধুনিক এজন্য, পুরনো কোনো অভিধানে এ শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশের নানা অঞ্চলে সরকারি ও বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বৃদ্ধাশ্রম। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রমের চাহিদা। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবারবিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। পারিবারিক নানা কারণে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণদের! আবার কেউ কেউ শেষ বয়সে কারও বোঝা হতে চান না, তাই স্বেচ্ছায় ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন বৃদ্ধাশ্রম।
প্রবীণদের শেষ প্রহরটুকু একটু ভালো কাটুক- এমন প্রত্যাশা নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের পথচলা শুরু হলেও বাস্তবতা হলো বৃদ্ধাশ্রমে ভালো নেই বৃদ্ধ মা-বাবারা। একদিকে স্বজনহীন একাকী জীবন, অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রমের নানা সমস্যা। পুষ্টিহীন খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং রোগ-শোকে সুচিকিৎসা না পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তবে শারীরিক কষ্টের চেয়ে মনের গহিনে লুকানো কষ্ট পীড়া দেয় আরও বেশি। প্রতিনিয়ত স্মৃতির জানালায় দাঁড়িয়ে ফিরে দেখেন পেছনে ফেলে আসা সুখ-দুঃখের স্মৃতি। বুকভরা বেদনা, চোখভরা জল নিয়ে নামমাত্র বেঁচে থাকেন তারা বৃদ্ধাশ্রমে।
অথচ এ মা-বাবা সন্তানের জন্য কত না কষ্ট করেছেন। ‘মা’ সন্তানকে দীর্ঘ ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে ধারণ করেন। এ সময় মায়ের যাপিত জীবনের চলাফেরায় ওঠা-বসায় অবর্ণনীয় ধকল সইতে হয়। গর্ভে সন্তানের নড়াচড়া করার কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। খেতে পারেন না। কিছু খেলেও বমি করে দেন। আর আঁতুড়ঘরে যাওয়ার আগে মা জীবনের আশা হারিয়ে ফেলেন। স্বামীর থেকে ক্ষমা চেয়ে নেন। শ্বশুর-শাশুড়ি বন্ধু-বান্ধবীদের থেকেও শেষ বিদায় নেন। কেননা প্রসবের সময় রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে অনেক মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শুধু কি তাই! আমাদের বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত মা কত আবদার পূরণ করেন। একটু অসুস্থ হলেই নিজে না ঘুমিয়ে সারারাত জেগে থাকেন। সন্তান কনকনে শীতের রাতে বিছানায় প্রস্রাব করে দেয়; এমন কষ্ট হাসিমুখে মেনে নেন। নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন দিনের পর দিন।
আর বাবা! সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখেন; আমার খোকা অনেক বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। তাই হৃদয় নিংড়ানো সবটুকু ভালোবাসা ঢেলে দেন সন্তানের জন্য। রক্ত পানি করা শ্রম খেটে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান বাবা। যে সন্তানের সুখের জন্য মা-বাবা জীবনের সবটুকু ঢেলে দেন, নিজের জন্য কিছুই রাখেন না, সেই সন্তানই যখন মা-বাবাকে দূরে ঠেলে দেয়, মা-বাবার বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মধ্যে একবুক কষ্ট নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
অথচ ইসলাম মা-বাবার অধিকার আদায়ে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়ই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩)
তা ছাড়া বিভিন্ন হাদিসে মা-বাবার আনুগত্য ও সেবাযত্ন করার অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক! জিজ্ঞাসা করা হলো, কে ধ্বংস হবে হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মা-বাবার দুজনকে অথবা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল কিন্তু তাদের সেবা করে জান্নাতে যেতে পারল না।’ (মুসলিম : ২৫৫১)। অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বাবা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছা, এর হেফাজত করো অথবা একে বিনষ্ট করে দাও।’ (তিরমিজি : ১৯০১)। আরও বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি মা-বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত।’ (তিরমিজি : ১৮৯৯)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন, কোন আমল মহান আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়? রাসুল (সা.) বললেন, ‘সময়মতো সালাত আদায় করা’। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোন কাজ? রাসুল (সা.) বললেন, ‘মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।’ (বুখারি : ৫৯৭০)
এমনকি মা-বাবা অমুসলিম হলেও তাদের সঙ্গে সদাচরণের কথা ইসলাম বলেছে। আবু হুরায়রা (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তার মায়ের থেকে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তখন মায়ের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করবেন তা জিজ্ঞেস করলে রাসুল (সা.) বললেন, ‘অবশ্যই তোমাকে তোমার মায়ের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে।’ তা ছাড়া রাসুল (সা.)-এর কাছে দুধমা হালিমা এলে তিনি তাঁর সম্মানে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিতেন।
উপরোক্ত আলোচনায় বোঝা যায়, মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বরং তাদেরকে কাছে রাখা, পরিবারের সবাই মিলেমিশে থাকা এবং সর্বাবস্থায় মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদের দেখাশোনা করা সন্তানের জন্য আবশ্যক।