পৃথিবীতে মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যাবতীয় কাজকর্মে আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলা। আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনের ব্যবস্থাপনাকেই বলা হয় ইসলাম। আরবি ‘ইসলাম’ শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহর হুকুম-আহকামের সামনে যারা আত্মসমর্পণ করে তাদেরকে বলা হয় মুসলিম বা মুসলমান। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্ম ইসলাম। মানুষের পার্থিব জীবনের শান্তি ও পরকালীন জীবনের মুক্তির ফায়সালা ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম হচ্ছে ইসলাম।’ (সুরা আল ইমরান : ১৯)।
ইসলামের মূল স্তম্ভ পাঁচটি- ঈমান, নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজ। এই পাঁচ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা এবং সে মোতাবেক আমল করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ দায়িত্ব।
ঈমান
ইসলামের প্রথম স্তম্ভ ঈমান। প্রতিটি মুসলমানের প্রথম দায়িত্ব ঈমান আনা। ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। প্রতিটি মুসলমানকে বিশ্বাস করতে হয় আল্লাহ একমাত্র উপাস্য এবং মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। তবে হাদিসে ঈমানের বিস্তারিত পরিচয় বর্ণিত হয়েছে এভাবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত জিবরাইল (আ.) একবার ছদ্মবেশে এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঈমান কাকে বলে?’ জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ঈমান হচ্ছে- আপনি বিশ্বাস স্থাপন করবেন আল্লাহ তায়ালার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবগুলোর প্রতি, আল্লাহর নবী-রাসুলদের প্রতি, কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং তকদিরের ভালো ও মন্দের প্রতি। এই হলো ঈমান।’ (বুখারি: ৫০)। ঈমানের এই ছয়টি বিষয়কে ইসলামের পরিভাষায় ‘ঈমানে মুফাসসাল’ অর্থাৎ ‘ঈমানের বিস্তারিত পরিচয়’ বলা হয়।
নামাজ
ঈমান আনার পর মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে নামাজ। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি মুসলমানকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। ভোরে ফজরের দুই রাকাত, দুপুরে জোহরের চার রাকাত, বিকালে আসরের চার রাকাত, সন্ধ্যায় মাগরিবের তিন রাকাত ও রাতে এশার চার রাকাত- এই সতেরো রাকাত নামাজ পড়া ফরজ। এ ছাড়া ওয়াজিব, সুন্নত, নফল নামাজ রয়েছে। সেগুলোও নিয়মিত আদায় করা উচিত। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের জন্য ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা : ১০৩)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুল (সা.) বললেন, ‘নামাজ’। (বুখারি ও মুসলিম)। আরও বলেন, ‘যে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তার থেকে দৃষ্টি উঠিয়ে নেন।’ (বুখারি : ১৮)। নবুয়তের দশম বছর পবিত্র মেরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। অস্বীকার করা কুফুরি।
জাকাত
ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হলো নামাজ ও জাকাত। পবিত্র কোরআনে যত জায়গায় নামাজের আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে পাশাপাশি শব্দে জাকাতের আদেশও দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সালাত আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য আগে পাঠাবে তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : ১১০)। জাকাত শব্দের অর্থ পরিশুদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি। জাকাতের মাধ্যমে মুসলমানদের সম্পদ পরিশুদ্ধ হয় এবং বরকত অবতীর্ণ হয়। জাকাত অস্বীকার করা কুফুরি। কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা থাকলে এবং তা এক বছর পূর্ণ হলে জাকাত ফরজ হয়। জাকাত গরিবের হক। কোরআনে জাকাতের হকদার আট শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। জাকাত অস্বীকার কুফুরি। জাকাত না দিলে কঠিন শাস্তি হবে পরকালে।
রোজা
রোজা উপমহাদেশে পরিচিত শব্দ। এর আরবি হলো সওম, যার অর্থ বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় যাবতীয় পানাহার এবং স্ত্রী সঙ্গম থেকে বিরত থাকার নাম সওম। ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পুরো দিন খাবার থেকে বিরত থাকবে হয়। পবিত্র কোরআনে সওমের বিধান এভাবে দেওয়া হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।
রমজানে এক মাস রোজা পালন করতে হয় প্রত্যেক মুসলমানকে। কেউ সফর কিংবা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে না পারলে পরে কাজা করতে হবে। হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতের একটি দরজা আছে, একে রাইয়ান বলা হয়। এই দরজা দিয়ে কেয়ামতের দিন একমাত্র রোজা পালনকারীরাই জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাদের ছাড়া অন্য কেউ এই পথে প্রবেশ করবে না। সেদিন এই বলে আহ্বান করা হবে- রোজা পালনকারীরা কোথায়? তারা যেন এই পথে প্রবেশ করে। এভাবে সব রোজা পালনকারী ভেতরে প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তারপর এ পথে আর কেউ প্রবেশ করেবে না।’ (বুখারি : ১৮৯৬; মুসলিম : ১১৫২)
হজ
আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি পুরুষ-নারীর ওপর হজ ফরজ। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহর তরফ থেকে সেসব মানুষের জন্য হজ ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যারা তা আদায়ের সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আল ইমরান : ৯৭)
হজের অর্থ ইচ্ছা করা ও সফর বা ভ্রমণ করা। ইসলামী পরিভাষায় হজ হলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত স্থানে বিশেষ কিছু কাজ সম্পাদন করা।
হজের নির্দিষ্ট সময় হলো ‘আশহুরুল হুরুম’ বা হারাম মাসগুলো তথা শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ; বিশেষত ৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত পাঁচ দিন। হজের নির্ধারিত স্থান হলো আরবের মক্কা নগরীর কাবাগৃহ, সাফা-মারওয়া, মিনা, আরাফা, মুজদালিফা ইত্যাদি। হজের বিশেষ আমল বা কর্মকাল হলো ইহরাম, তাওয়াফ ও সাঈ, উকুফে আরাফা, উকুফে মুজদালিফা, উকুফে মিনা, দম ও কোরবানি, হলক ও কসর। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত হজের পুরস্কার বেহেশত ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।’ (বুখারি : ১৭৭৩)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যথাযথভাবে হজ পালন করে, সে পূর্বেকার পাপ থেকে এরূপ নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেরূপ সে
মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন নিষ্পাপ ছিল।’ (বুখারি : ১৫২১)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক