আমানতের সওয়াব ও খেয়ানতের শাস্তি

মাহবুবুর রহমান নোমানী

ইসলামের আলো

ইসলামে আমানত ও খেয়ানত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিভাষা। আমানত অর্থ ভরসা করা, আস্থা রাখা। অর্থাৎ কাউকে বিশ্বাস করে তার কাছে কোনো

2022-03-25T07:02:57+00:00
2022-03-25T07:23:51+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
আমানতের সওয়াব ও খেয়ানতের শাস্তি
মাহবুবুর রহমান নোমানী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ মার্চ, ২০২২, ৭:০২ এএম  আপডেট: ২৫.০৩.২০২২ ৭:২৩ এএম  (ভিজিট : ৯০৯)
ইসলামে আমানত ও খেয়ানত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিভাষা। আমানত অর্থ ভরসা করা, আস্থা রাখা। অর্থাৎ কাউকে বিশ্বাস করে তার কাছে কোনো কিছু গচ্ছিত রাখলে তাকে আমানত বলে। আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য দায়িত্ব। ইসলাম আমানত রক্ষার প্রতি অত্যন্ত জোর তাগিদ করেছে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের বিচার-মীমাংসা করবে তখন ইনসাফভিত্তিক মীমাংসা করো। আল্লাহ তোমাদের সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ (সুরা নিসা : ৫৮)

আমানতের বস্তু পরিশোধ না করলে তাকে খেয়ানত বলে। খেয়ানত অত্যন্ত মারাত্মক গুনাহ। খেয়ানত করাকে নবীজি (সা.) মুনাফিকের আলামত সাব্যস্ত করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ‘মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি। তা হলো- মিথ্যা কথা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খেয়ানত করা।’ (বুখারি : ৩৩) মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রয়েছে, ‘যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে।’ হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘এমন খুব কম হয়েছে যে, নবীজি (সা.) ভাষণ দিয়েছেন অথচ তাতে একথা বলেননি- ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই। আর যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিয়মানুবর্তিতা নেই তার ধর্ম নেই।’ (মুসনাদে আহমদ : ১২৪০৬)। এই হাদিস দুটি থেকে খেয়ানতের ভয়াবহতা কতটা মারাত্মক- তা সহজে বুঝে আসে।

আমানত বলতে আমরা কেবল টাকা-পয়সার বিষয়টি বুঝি। কিন্তু আমানতের অর্থ ও মর্ম আরও ব্যাপক। এর ক্ষেত্র ও পরিধি বিশাল। আল্লাহর দেওয়া সবকিছুই আমাদের কাছে আমানত। সহায়-সম্পত্তি সন্তান-সন্তুতি, এমনকি আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও আল্লাহর দেওয়া আমানত। পবিত্র কোরআন এবং ইসলামের বিধি-বিধান আমাদের কাছে আমানত। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আসমান-জমিন ও পর্বতের কাছে এই আমানত পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা এর বোঝা বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করল এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। আর মানুষ তা বহন করেছে। নিশ্চয়ই মানুষ জালিম, অজ্ঞ।’ (সুরা আহজাব : ৭২)। আয়াতে বর্ণিত আমানত দ্বারা দ্বীনের সব বিধি-বিধান উদ্দেশ্য। এসব বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা আমানতের খেয়ানত। আল্লাহ তায়ালার মর্জির বিপরীতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানত। কোরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ চোখের খেয়ানত সম্পর্কে অবগত আছেন।’ (সুরা মুমিন : ৯)। এই আয়াতে চোখের পাপ না বলে চোখের খেয়ানত বলা হয়েছে। যা দ্বারা ‘চোখ’ আমানত হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। এমনিভাবে হাত, পা, জিহ্বা, কান প্রভৃতি অঙ্গও আমানত। আমানতের ব্যাপকতা এত অধিক যে, মজলিসের কথা-বার্তাকে আমানত বলা হয়েছে। এমনকি যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয় হাদিসে তাকে আমানতদার আখ্যায়িত করা হয়েছে। চাকরিজীবীদের চাকরির সময়টুকুও আমানত। সেই সময়ে কাজ ফেলে রেখে গল্প-গুজবে মেতে ওঠা বা কাজে ফাঁকিবাজি দেওয়া খেয়ানতের শামিল। এমনিভাবে অফিসের জিনিসপত্র আমানত। তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করলে খেয়ানত হবে। আমানতের মতো খেয়ানতের বিষয়টাও ব্যাপক। কারও গোপন কথা কান পেতে শুনা বা টেলিফোনে আড়ি পাতা খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে খেয়ানত মহামারির মতো আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ এটি মারাত্মক কবিরা গোনাহ। 

মুফতি শফি (রহ.) লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা এবং দায়-দায়িত্ব একদিকে আল্লাহর দেওয়া আমানত অপরদিকে জনগণেরও আমানত। তাই এসব দায়িত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (তিরিমিজি : ১২৪)। হজরত আবুজর গিফারি (রা.) নবীজির কাছে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তলব করলে তিনি বললেন, আবু জর! তুমি দুর্বল প্রকৃতির লোক। আর এটা হচ্ছে একটি আমানত। কেয়ামতের দিন এটা লজ্জা ও অপমানের কারণ হবে। তবে যে ব্যক্তি তা তার দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং যথাযথভাবে সে দায়িত্ব পালন করেছে তার বিষয়টি ভিন্ন।’ হজরত ওমর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে বললেন, ‘আমার রাষ্ট্রের একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায় এর জন্য আমি দায়ী হব।’ তিনি রাতের আঁধারে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজখবর নিতেন। 

বর্ণিত আছে, হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর একদা রাতের বেলা বাতির আলোতে রাষ্ট্রীয় কাজ করছিলেন। এমন সময় ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে তার কাছে এলেন। আলী (রা.) বাতি নিভিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাব দিলেন, এতক্ষণ আমি সরকারি কাজ করছিলাম। তাই সরকারি তৈল ব্যবহার করেছি। এখন তো ব্যক্তিগত কাজ করছি। সরকারি বাতি ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানত হবে।’ দায়-দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে যোগ্য, কর্মদক্ষ এবং আমানতদার ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত। অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া কেয়ামতের লক্ষণ। এ মর্মে নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষায় থাকো। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা আমানত নষ্ট করণের শামিল। আর এমনটি করা হলে বুঝবে কেয়ামত সন্নিকটে।’ (বুখারি : ৫৯)



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: