ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ভূমি ও তহশিল অফিসগুলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। এ অফিসগুলোতে টাকা ছাড়া নড়ে না ফাইল, মেলে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। সেবা প্রাপ্তির জন্য ৮০ শতাংশ মানুষকে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। দাবি করা উৎকোচ না দিলে সেবাগ্রহীতারা পান না তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা।
সূত্রমতে, সরকারের নির্ধারিত ফি অনুযায়ী জমির নামজারি করতে লাগে ১ হাজার ১৭০ টাকা; কিন্তু এই অফিসগুলো থেকে ই-নামজারি করতে গিয়ে লেগে যায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির নামজারির ক্ষেত্রে খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
ভুতুড়ে এ খরচের অনুসন্ধানে উঠে আসে নানা তথ্য। অনলাইনে আবেদনের পর ই-নামজারির নথি জমা দেওয়ার জন্য উপজেলা দক্ষিণের ভূমি অফিসে প্রবেশ করে এই প্রতিবেদক বলেন- নামজারির নথি জমা দেওয়ার জন্য এসেছি, কী করতে হবে?
কম্পিউটার অপারেটর জিজ্ঞেস করেন কয়টি এনেছেন? প্রতিটির জন্য একশ করে টাকা দিতে হবে। টাকা দিয়ে নথি জমা দেওয়ার পর বলা হয়, আপনার মোবাইলে একটি মেসেজ যাবে। সে অনুযায়ী ইউনিয়ন তহশিল অফিসে যোগাযোগ করবেন। ঠিক তার এক সপ্তাহ পর শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে পলাশ নামে এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মূল কাগজপত্র নিয়ে অফিসে দেখা করতে বলেন। কাগজপত্র সব ঠিক থাকা সত্ত্বেও তিনি দেড় হাজার টাকা দাবি করলেন।
বলেন, টাকা না দিলে রিপোর্ট দেওয়া হবে না, এটা অফিসের খরচ বাবদ সবাইকে দিতে হয়। ঠিক তার দুই সপ্তাহ পর উপজেলার দক্ষিণ ভূমি অফিস থেকে সাদ্দাম নামে এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে আসল কাগজপত্র নিয়ে অফিসে দেখা করতে বলেন। দেখা করার পর তিনি বললেন, তিন হাজার টাকা দিলে কাজটি হয়ে যাবে।
টাকা দিয়ে কাজ সম্পন্ন করার পর তিনি বলেন, ‘ডিসিআর কাটার জন্য আনোয়ার স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’ আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার সহকারী বলেন, দুই হাজার টাকা নিয়ে আসবেন। আপনার ডিসিআর দুদিন পর পেয়ে যাবেন।
এভাবেই কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ ভূমি অফিসে জমির নামজারি হয়। মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয় উপজেলা ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বিভিন্ন স্তরে ভাগ দেওয়ার কথা বলে।
এ ছাড়া জমির নবায়ন ফি, ভূমি উন্নয়ন কর ও মিস কেস করতে সরকার নির্ধারিত ফির কয়েকগুণ বেশি অর্থ না দিলে কাজ হয় না বলে জানান সেবাগ্রহীতারা। তাদের অভিযোগ, মিস কেস তদন্তের জন্য কোনো কর্মকর্তা সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে তাকে যাতায়াত ও চা-নাস্তা খরচ বাবদ দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনের জন্য দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর উপজেলা ভূমি অফিসে রিপোর্ট গেলে টাকার বিনিময়ে মিস কেসের রায় এনে দেওয়ার চুক্তি করেন অফিসটির নাজির ও মিসকেস সহকারী আনোয়ার হোসেন। মিসকেসের রায়ের জন্য তিনি অর্থের পরিমাণও নির্ধারণ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে অফিস পরিচালনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের। শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচজন। কিন্তু অফিসটিতে দেখা গেল ১০ থেকে ১২ জন যুবক চেয়ার-টেবিল নিয়ে কাজ করছেন। বহিরাগতদের দখলে চলে গেছে অফিসের রেকর্ডরুম। তারা নাড়াচারা করেন গোপন নথিপত্রও। আর ভূমি অফিসে আসা সেবাগ্রহীতারাও কাগজপত্র নিয়ে তাদের পিছেই ছুটছেন। সেবাগ্রহীতারা জানান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর ও মিস কেসসহ সব কিছুতেই ঘুষ দিতে হয় তাদের। সরকারি ফি থেকে বেশি টাকা না দিলে কাজ হয় না এখানে।
অন্যদিকে সরকারি ওয়েবসাইট নকল করে ভুয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে অফিসটিতে। তাছাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের নামজারি সহকারীর সোহেল রানার টেবিলে আর্থিক লেনদেনের দৃশ্যও ধরা পড়ে প্রতিবেদকের ক্যামেরায়। আইন না মেনে বহিরাগতদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজও করান তিনি। যে কম্পিউটারটি তার চালানোর কথা সেটি চালান অন্য কেউ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সোহেল রানার কম্পিউটারটি যিনি অপারেট করছেন তিনি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত কেউ নন।
কোণ্ডা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. এসবার হোসেন সারোয়ার সময়ের আলোকে জানান, শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা আফরোজা খাতুন ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ তার কাছে নয় হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তিনি সাত হাজার টাকা দেন। ভূমি কর্মকর্তা আফরোজা খাতুন তাকে রসিদ দেন ৪ হাজার ৭৮২ টাকার। এর আগেও অফিসটির ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রণজিত চন্দ্র নাথ অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কম টাকার রসিদ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে এই ভুক্তভোগীর।
তিনি জানান, সরকারি ফি থেকে বেশি টাকা না দিলে কাজ হয় না এখানে। বেশি টাকা কেন দেব বলতে গেলে দুর্ব্যবহার করে অফিস থেকে বের করে দেন।
আরেক ভুক্তভোগী শুভাঢ্যা ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মো. গোলাম হাসান জানান, নিজের নামজারি নিজে করতে গেলে এটা নেই সেটা নেই বলে নামজারি বাতিল করে দেওয়া হয়। তাই বাধ্য হয়ে লোক ধরতে হয়। এতে নামজারি করতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লেগে যায়।
তিনি জানান, তার নিজের নামে নামজারির আবেদন করে নথি জমা দেওয়ার পর শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বণ্টননামা দলিল নিয়ে দেখা করতে বলেন। পরে দলিল নিয়ে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রণজিত চন্দ্র নাথের সঙ্গে দেখা করলে তার আবেদন বাতিল হয়েছে বলে নতুন করে ফের আবেদন করতে বলেন। দ্বিতীয়বার আবেদন করে অফিসে যাওয়ার পর ভূমি কর্মকর্তা রণজিত চন্দ্র নাথ তার সহকারী ইমরানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তার কাছে গেলে তিনি জানান রিপোর্ট নিতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ লাগে। তাই এক হাজার টাকা দিতে হবে। টাকা কেন দিতে হবে জানতে চাওয়া হলে ইমরান বলেন তাদের বেতন নেই। তাই চা-নাস্তা ও অফিস খরচ বাবদ এটা দিতে হবে। পরে তিনি টাকা দেওয়ার পর বণ্টননামা দলিল ছাড়াই নথি উপজেলা ভূমি অফিসে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, টাকা দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। না দিলে নতুন করে একটার পর একটা সমস্যা সৃষ্টি হয়। এই অফিসে হোল্ডিং খোলার জন্যও দিতে হয় ২০০ টাকা, একটা খসড়া তুলতে গেলেও দিতে হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। নামজারি করার পর ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গেলে এক কর্মকর্তা বলেন, ছয় হাজার টাকা, আরেকজন বলেন ছাব্বিশ হাজার টাকা। পরে তার কাছ থেকে সঠিক ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৫০ টাকা।
সেবাপ্রত্যাশী মো. মালেক নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, মিস কেসের রায়ের জন্য উপজেলার দক্ষিণের ভূমি অফিসের নাজির ও মিস কেস সহকারী আনোয়ার স্যার আমার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা চেয়েছেন। আমি গরিব মানুষ। তিন হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকার জন্য কাজটি আটকে রেখেছেন।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, সব কিছু ঠিক থাকার পরও টাকা না দেওয়ায় তার নামজারিটি আটকে ছিল। অথচ যারা টাকা দিয়েছে সবাই নামজারির কাগজ হাতে পেয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা আফরোজা খাতুন কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে ঘুষ লেনদেনের কথা অস্বীকার করে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রণজিৎ চন্দ্র নাথ সময়ের আলোকে জানান, অফিসটিতে অতিরিক্ত দালাল থাকার কারণে কে প্রকৃত সেবাগ্রহীতা আর কে দালাল সেটি আলাদা করা সম্ভব হয় না।
আর অতিরিক্ত টাকা দালালরা নিচ্ছে দাবি করে তিনি জানান, জনবল সঙ্কটের কারণে তার অফিসে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বাইরেও অতিরিক্ত দুই-তিনজন লোক কাজ করছেন। এ ছাড়া দুইজন কম্পিউটার অপারেটরকে নিজেদের বেতন থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দেওয়া হয় বলেও জানান এই ভূমি কর্মকর্তা।
সরকারি ওয়েবসাইট নকল করে ভুয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন তার অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যিনি কাজ করতেন তিনি সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে হুবহু ওয়েবসাইট নকল করে ভুয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করে অনলাইন থেকে রসিদ প্রদান করেন। বিষয়টি ধরা পরার পর তাকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৫ দিনের জেল দেওয়া হয়। বর্তমানে সে জেলে আছে। কেরানীগঞ্জ দক্ষিণের উপজেলা ভূমি অফিসের নামজারি সহকারী সোহেল রানার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানাতে অফিসটির নাজির মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অফিসে দেখা করতে বলে ফোনটি কেটে দেন।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু রিয়াদ জানান, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো অভিযোগ নেই। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
কেরানীগঞ্জের ইউএনও মো. মেহেদী হাসান বলেন, কেরানীগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা আছেন প্রত্যেকের আইডি কার্ড থাকবে। এর বাইরে বহিরাগত কোনো লোক অফিসে কাজ করতে পারবে না।
/জেডও