ইসলামে ফরজ বা অবশ্যকরণীয় বিধান পর্দা। পর্দা পালনের মাধ্যমে ইহ ও পরকালীন অনেক কল্যাণ লাভ করা যায়। আর তা লঙ্ঘনে ধর্মীয়, আত্মিক, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিপর্যয় ডেকে আনে। পর্দাহীনতার কারণে মানুষ আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর অবাধ্য হিসেবে গণ্য হয়। সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটে। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়। পরকীয়ার সৃষ্টি হয়ে ডিভোর্স বা তালাকের মতো নিকৃষ্ট ঘটনাও ঘটে।
নারীদের জন্য যেমন পর্দা পালন ফরজ, পুরুষদের জন্যও তেমনই ফরজ। ইসলামের বিধানে উভয়কেই পর্দা পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের সমাজে সবসময় নারীদের পর্দার কথা আলোচনা করা হয় এবং সেইসঙ্গে ভুলে যায় পুরুষের পর্দা পালনের কথা। অনেকে বলেন, ‘পর্দা তো শুধু নারীরা পালন করবে, পুরুষদের আবার পর্দা কিসের?’ তাদের ধারণা ভুল। তবে নারীর পর্দা ও পুরুষের পর্দার ব্যবহারিক পার্থক্য রয়েছে। নারী বাইরে বেরুলে বোরকা-চাদর ইত্যাদির মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থা ঢেকে রেখে পর্দা করবে। আর পুরুষ কাপড়ের মাধ্যমে নিজেকে আড়াল করে পর্দা করবে না। তার পর্দা হবে নিজেকে সংযত রাখা, চোখের হেফাজত করার মাধ্যমে। পুরুষ পরনারীর দিকে তাকাবে না, হুটহাট নারীর ঘরে ঢুকবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিই পর্দা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ এ ব্যাপারে অবগত। আর ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর : ৩০)। এই আয়াতের শুরুতেই ঈমানদার পুরুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে। ইচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাত কিংবা তাকানোই হচ্ছে যৌন প্রবৃত্তির সূচনা এবং এর শেষ পরিণতি পাপ ও ফেতনাসহ জিনা-ব্যভিচার, যার পরিণাম ভয়ঙ্কর।
নারীদের তুলনায় পুরুষকে যেহেতু বাইরের ও পরিশ্রমী কাজ বেশি করতে হয়, সেজন্যই পুরুষের জন্য বোরকা কিংবা আবরণ ব্যবহার করে পর্দা করার কথা বলা হয়নি। পক্ষান্তরে নারীরা সাধারণত ঘরেই থাকে বেশি, বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন খুব একটা পড়ে না। তাই তাদেরকে বেরুনোর সময় পুরুষদের থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে বলা হয়েছে।
উম্মুল মুমিনীন হজরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একদিন আমি এবং মাইমুনা (রা.) [রাসুল (সা.)-এর পত্নীদ্বয়] রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বসা ছিলাম। ইত্যবসরে অন্ধ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা.) সেখানে আসছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বললেন, তোমরা আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম থেকে পর্দা করো। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তিনি কি অন্ধ নন? তিনি তো আমাদেরকে দেখতে পাবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা দুজনও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখতে পাবে না?’ (আবু দাউদ : ২/৫৬৮)
ইসলামের দৃষ্টিতে যেসব নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে বৈধ নয়, তাদেরকে মাহরাম বলে। তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ জায়েজ আছে। আর যাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ, তাদেরকে গায়রে মাহরাম বা বেগানা বলে। এই বেগানা নারী-পুরুষের পর্দাহীনভাবে বিয়েপূর্ব দেখা-সাক্ষাৎ জায়েজ নয়। তা হারাম ও কবিরা গুনাহ। নারীদের পর্দার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হলেও পুরুষদের বিষয়টি তেমন আলোচিত নয়। পর্দা ফরজ হওয়ার মূল কারণ, নারী ও পুরুষ নামের বিপরীত লিঙ্গের উপস্থিতি। নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা প্রাকৃতিক নিয়ম। তাই প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে বেপর্দা অবস্থায় একে অপরের সামনে না যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। পর্দা পালনের এ বিধান উভয় শ্রেণির সমন্বিত প্রয়াসেই কার্যকর করা সম্ভব। নারীদের আপাদমস্তক আর পুরুষদের কমপক্ষে নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢেকে রাখা আবশ্যক। সৃষ্টিগত কারণে পোশাকের পর্দার ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি ইসলাম কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বটে। কিন্তু দৃষ্টিগত ও হৃদয়গত পর্দায় পুরুষদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বেগানা নারীর সৌন্দর্যের প্রতি যৌন লালসা নিয়ে তাকাবে, কিয়ামতের দিন তার চোখে সিসা ঢেলে দেওয়া হবে।’ (ফাতহুল কাদির)। হজরত বুরায়দা ইবনে আল-হাসিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বলেন, ‘হে আলী! দৃষ্টির পর দৃষ্টি ফেলো না। অনিচ্ছাকৃত যে দৃষ্টি পড়ে এর জন্য তুমি ক্ষমা পাবে। কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টির জন্য ক্ষমা পাবে না।’ (আবু দাউদ : ১/২৯২)। তিনি পুরুষদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘পথের হকগুলোর একটি অন্যতম হক হলো, দৃষ্টিকে সংযত রাখা।’ (বুখারি : ৬২২৯)। তিনি আরও বলেছেন, ‘নারীদের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করো না। ওই সত্তার শপথ- যার হাতে আমার প্রাণ, যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে একান্তে থাকে, তখনই তাদের মধ্যে তৃতীয় হিসেবে শয়তান এসে অনুপ্রবেশ করে এবং তার জাল বিস্তার করতে থাকে। কোনো বেগানা নারীর কাঁধের সঙ্গে ধাক্কা লাগার চেয়ে পচা দুর্গন্ধযুক্ত নর্দমায় জড়ানো শূকরের সঙ্গে ধাক্কা লাগাও সহনীয়।’ (নাইলুল আওতার : ৬/১২০)। কোনো পুরুষ বেগানা নারীকে অথবা কোনো নারী বেগানা পুরুষকে তো দেখতে পারবেই না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষও কোনো পুরুষকে এবং কোনো নারীও কোনো নারীকে যেন উলঙ্গ অবস্থায় না দেখে।’ (মুসলিম : ৩৩৮)
সুতরাং বোঝা গেল, শুধু নারীদের ওপরই নয়, পুরুষদের ওপরও পর্দা করা ফরজ। পর্দার কিছু বিধান আছে, যা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন- সতরের বিধান, নজরের বিধান, নারী-পুরুষের মেলামেশার বিধান ইত্যাদি। তবে কিছু বিধান শুধু মৌলিকভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন পরিবারের কর্তা হিসেবে অধীনস্থদের পর্দা সম্পর্কে অবগত করার বিধান এবং তাদের পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের বিধান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালক হিসেবে সর্বশ্রেণির মুসলিম নর-নারীর জন্য পর্দার বিধান। মূল কথা হচ্ছে ইসলামী শরিয়তে পর্দার বিধান শুধু নারীর জন্য প্রযোজ্য নয়, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তেমনই পর্দার বিধান শুধুই ব্যক্তিজীবনের বিষয় নয় বরং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আসুন আমরা নারী-পুরুষ পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে এই অত্যাবশ্যকীয় পর্দা বিধান পালন করে ইহ ও পরকালীন কল্যাণ লাভ করি। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বোঝার ও সুন্দর সমাজ গড়ার তাওফিক দিন।
সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম