
মানুষের মৃত্যু অনিবার্য সত্য। মৃত্যু থেকে কেউ রেহাই পাবে না। মৃত্যু থেকে বাঁচতে যদি কেউ শক্ত দুর্গে কিংবা গহিন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে, মৃত্যু সেখানেও পাকড়াও করবে। সুতরাং মৃত্যু থেকে বাঁচতে নয়, মৃত্যুর জন্যই প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার মানুষের। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৫)।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের হায়াত ঠিক করে রেখেছেন। হায়াত ফুরিয়ে গেলে মৃত্যুর ফেরেশতা এসে উপস্থিত হবেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের কারও মৃত্যু আসে তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার আত্মা হস্তগত করে নেয়।’ (সুরা আনআম : ৬১)। বোঝা গেলÑ মৃত্যু অবশ্যই আসবে, এ থেকে বাঁচার সাধ্য কারও নেই। মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীর দায়িত্ব কী? মৃত ব্যক্তি তো আর নিজের কাফন-দাফন নিজে করতে পারবে না। নিজের রেখে যাওয়ার সম্পত্তির ওপর দখলদারিত্ব রাখতে পারে না। সুতরাং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা মৃত্যুর পর চারটি কাজ করবে।
কাফন-দাফনের ব্যবস্থা
মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীরা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। পুরুষ হলে তিনটি কাপড়Ñ ইজার-লেফাফা-কুরতা। মহিলা হলে পাঁচটি। পুরুষের তিনটির সঙ্গে আরও দুটি কাপড় সেরবন্দ ও সিনাবন্দের ব্যবস্থা করবে। কবর খনন করবে। নিজে না পারলে যারা খবর খুঁড়তে পারদর্শী তাদের মাধ্যমে কবর খনন করাবে। জানাজার ব্যবস্থা করাবে। হাদিসে আছে, আর যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরাবে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে জান্নাতের সূ² ও পুরু রেশমের বস্ত্র পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি তার জন্য কবর খুঁড়ে তাকে দাফন করবে, আল্লাহ তার জন্য এমন এক গৃহের সওয়াব জারি করে দেবেন, যা সে কেয়ামত পর্যন্ত বাস করার জন্য দান করে থাকে। (রিয়াদুস সালেহিন : ১২৯২)
ঋণ পরিশোধ
মৃত ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ মানুষের হক। যতক্ষণ মানুষ মাফ করবে না, ততক্ষণ আল্লাহও মাফ করবেন না। মৃত ব্যক্তির নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। হাদিসে আছে, যার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তাঁর কসম। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়, আবার জীবন লাভ করে; আবার শহীদ হয় এবং আবার জীবিত হয়, পরে আবার শহীদ হয়, আর তার ওপর ঋণ থাকে, তবে তার পক্ষ থেকে সে ঋণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (নাসায়ি : ৪৬৮৪)। ধরুন, মৃত ব্যক্তিটি আপনার বাবা। আপনার বাবা আপনাকে কত কষ্টে লালন-পালন করেছিলেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অন্যের কাজ করে আপনাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আপনাকে সমাজে মর্যাদাশালী গড়ে তুলেছেন। আজ তিনি শায়িত। তার নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। আপনি একজন সন্তান হয়ে কি আপনি চান না আপনার বাবা জান্নাতে যাক? যদি চান তা হলে সবার আগে আপনার বাবার ঋণ পরিশোধ করুন। কেননা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
অসিয়ত বাস্তবায়ন করা
মৃত ব্যক্তির বৈধ অসিয়ত পূরণ করা। যেমন কেউ অসিয়ত করল, আমি মারা যাওয়ার পর আমার এই টাকাগুলো দিয়ে একটা মাদ্রাসা করে দেবে। অথবা কেউ বলল, এই টাকাগুলো দিয়ে ১০ জন মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের খাবার খাওয়াবে। তা হলে তার সম্পদের তিন ভাগের একভাগ দিয়ে তার অসিয়ত পূরণ করতে হবে। তবে যদি কেউ অবৈধপথে টাকা খরচের অসিয়ত করে যায়, যেমন কেউ বলল, আমার মৃত্যুর পর এই টাকা দিয়ে অমুক জায়গায় গানের আসর হবে বা অন্য কোনো হারাম কাজ হবে, তা হলে তা পূরণ করা জরুরি নয়; বরং তা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
মিরাস বণ্টন করা
এ তিনটি কাজ করার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তা ওয়ারিশের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন করে দিতে হবে। বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শে যার যতটুকু প্রাপ্য ভাগ করে নেওয়া চাই। পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা মনে করিÑ মানুষ মরে যাওয়ার পর চার দিনা, চল্লিশা ও বছর শেষে একটা মেজবান দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। অথচ এসব কিছু কুসংস্কার, পেটপূজার ধান্ধা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন। আমিন।