মানব চরিত্রের উত্তম গুণাবলির অন্যতম হলো ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। পৃথিবীতে আমাদের পথচলা ফুলের গালিচার মতো মসৃণ হবে না। নানা সময় নানা বিপদ-আপদ চলে আসতে পারে। তখন ধৈর্য, দৃঢ়তা, অবিচলতা ও দ্বিধাহীন সঙ্কল্পের মাধ্যমে সব বিপদ-আপদ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো বিপদে পড়লে ধৈর্যহারা না হয়ে মহান আল্লাহর সাহায্য চাওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা : ১৫৩)।
ধৈর্য সফলতার চাবিকাঠি। ধৈর্যহীন ব্যক্তি সব কাজে ব্যর্থ হয়। আনন্দ-প্রফুল্লতার দিনগুলোতে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হয়। আর কষ্ট ও মসিবতের প্রহরগুলোতে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীলদের অফুরন্ত প্রতিদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার পুরোপুরিভাবেই দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার : ১০)। আল্লাহর পক্ষ থেকে ধৈর্যশীলদের প্রতি রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল (সা.) আপনি ধৈর্যশীলদের জান্নাতের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা : ১৫৫)।
মানুষের মধ্যে পাশব প্রবৃত্তি সর্বদা অন্যায় ও গর্হিত পাপ কাজ করা জন্য প্রলুব্ধ করতে থাকে। আর পাপ কাজ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার জন্য ধৈর্য একটি অপরিহার্য উপাদান। যারা ধৈর্য ধারণ করে মানব মনের পাশব প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তারা জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং সর্বদা আল্লাহর পথে প্রস্তুত থাকো, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আলে ইমরান : ২০০)।
দুনিয়ায় মানুষের বিপদ-আপদ আসা স্বাভাবিক। কেননা বিপদাপদ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ। কিন্তু পরম করুণাময় এর বিনিময়ে বান্দাদের গুনাহ মাফ করে দেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফোটে, এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (বোখারি : ৫৬৪১)।
মুমিন জীবনে ধৈর্যের পরীক্ষা অনেকভাবে হতে পারে। সাধারণভাবে ধৈর্যের তিনটি ক্ষেত্র রয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষার ধৈর্য। দ্বিতীয়ত, পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ আপতিত বিপদাপদে ধৈর্য। তৃতীয়ত, মানুষের তৈরি বিপদাপদে ধৈর্য। সব ধরনের বিপদাপদেই মুমিন বান্দার কর্তব্য হচ্ছে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা। কোনো ক্ষেত্রে অধৈর্য হয়ে আল্লাহর প্রতি অশোভন বাক্য উচ্চারণ করা জঘন্য পাপ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের ওপর কোনো বিপদ-মসিবত এসে পড়লে তার ওপর ধৈর্য ধারণ করো। বিপদে ধৈর্য ধারণ করা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাহসিকতাপূর্ণ কাজ।’ (সুরা লোকমান : ১৭)।
ধৈর্যশীলতা মুমিন বান্দার একটি কল্যাণকর গুণ। যার অনুশীলন ছাড়া ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে সাফল্য আশা করা যায় না। যদিও ধৈর্য ধারণ করা খুবই কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ, তথাপি এটা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) আনসার সাহাবিদের কিছু লোককে বলেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে, তিনি (আল্লাহ) তাকে ধৈর্যশীলই রাখেন। আর যে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন। ধৈর্যের চেয়ে বেশি প্রশস্ত ও কল্যাণকর কিছু কখনও তোমাদের দান করা হবে না।’ (বোখারি : ৬৪৭০)।
দুনিয়ায় নবীরা হলেন সবচেয়ে ওপরের স্তরের মানুষ। তাঁদের ওপরই পরীক্ষা এসেছিল সবচেয়ে বেশি। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবীকেই এ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ঈমানের পরীক্ষা দিয়েছেন। ধৈর্য দ্বারা তিনি সব পরীক্ষায় সফল হয়েছেন। তেমনিভাবে দুনিয়ায় যারাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হয়েছেন, তারাই ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। অতএব প্রত্যেক মুমিনের উচিত বিপদ-আপদে বিচলিত না হয়ে পড়া, ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্যের প্রত্যাশা করা।