সেজদা : ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য

আরিফ খান সাদ

ইসলামের আলো

মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন তাঁর ইবাদত ও বন্দনার জন্য। আর ইবাদতের মূল মর্মবাণী হলো আল্লাহর সামনে সর্বতোভাবে অবনমিত হওয়া,

2022-09-10T02:31:37+00:00
2022-09-10T02:31:37+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
সেজদা : ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ২:৩১ এএম   (ভিজিট : ৫৭১)
মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন তাঁর ইবাদত ও বন্দনার জন্য। আর ইবাদতের মূল মর্মবাণী হলো আল্লাহর সামনে সর্বতোভাবে অবনমিত হওয়া, যাকে পরিভাষায় সেজদা বলা হয়। 
সেজদা হলো আল্লাহর হক এবং আল্লাহর প্রতি যাবতীয় ইবাদতের শ্রেষ্ঠাংশ। আল্লাহ মানুষকে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর মানবজাতির সেজদার প্রতীক হিসেবে কাবাগৃহকে নির্ধারণ করেছেন। ফলে সারা বিশ্বের মানুষ আল্লাহর আদেশে কাবাগৃহকে কেবলা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ঠিক তেমনি সৃষ্টির সূচনায় আদম (আ.)- কে ‘কেবলা’ বানিয়ে সেজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফেরেশতারা এই নির্দেশ পালন করেন। কিন্তু ইবলিস সেজদা করতে অস্বীকার করে। এ ঘটনার মাধ্যমে সেজদার মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য প্রকাশ হয়।

আল্লাহকে সৃষ্টিজগতের সেজদা

পৃথিবীর সবকিছুই মহান আল্লাহর জন্য সেজদা করে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর আল্লাহকে সেজদা করে- যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে এবং তাদের ছায়াও সেজদা করে- সকালে ও সন্ধ্যায়, ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় (সুরা রাদ : ১৫)।’ 

অন্যত্রে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখো না যে আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও বহু মানুষ। আর বহু মানুষের ওপর (যারা সেজদা করতে অস্বীকার করেছে) শাস্তি অবধারিত হয়েছে। 

বস্তুত আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন তাকে সম্মান দেওয়ার কেউ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা চান তা- ই করেন (সুরা হজ : ১৮)।’ শুধু নিম্নজগতে নয়, সেজদার এই নিয়ম রয়েছে ঊর্ধ্বজগতেও। সেখানে ফেরেশতা মহান আল্লাহর উদ্দেশে সেজদা করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুগুলোর প্রতি লক্ষ করে না। তাদের ছায়া ডানে ও বাঁয়ে ঢলে পড়ে আল্লাহর প্রতি সেজদাবনত হয় বিনীতভাবে। আসমান ও জমিনে যত প্রাণী আছে, সবই আল্লাহকে সেজদা করে এবং ফেরেশতারাও। আর তারা অহঙ্কার করে না (সুরা নাহল : ৪৮- ৪৯)।’

ইহকাল- পরকালে সেজদার পরীক্ষা

সৃষ্টিজগতের সব জীব ও জড়োবস্তু আল্লাহর ইবাদত করে বা সেজদা করে। কিন্তু মানুষ ও জিন ছাড়া কারো হিসাব হবে না এবং পরীক্ষাও হবে না। সেজদার এই পরীক্ষা হবে দুনিয়া ও আখেরাতে। একদল দুনিয়ায় আল্লাহকে সেজদা করে। পরকালের পরীক্ষায়ও এই দল আল্লাহর পদতলে সেজদার মাধ্যমে জয়যুক্ত হবে, আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে পরম সুখে অনন্তকালের জান্নাতে বসবাস করবে। পক্ষান্তরে আরেক দল আল্লাহকে সেজদা করে না। 

আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণও করে না। আল্লাহকে অস্বীকারকারী এই দল সেজদা না করার কারণে পরকালেও আল্লাহর পরীক্ষায় সেজদা করতে পারবে না। ফলে তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। 

হাদিস শরিফে এসেছে, কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ মানুষের উদ্দেশে বলবেন, ‘আমি কি তোমাদের রব? সবাই বলবে, হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব। সে সময় নবীরা ছাড়া আর কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলবে না। 

আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কি কেউ তার কোনো চিহ্ন জানো? তারা বলবে, পায়ের নলার তাজাল্লি। সেই সময় পায়ের নলা উন্মোচন করা হবে। তখন সব ঈমানদার ব্যক্তি সেজদায় পড়ে যাবে। তবে যারা দুনিয়ায় প্রদর্শনীর জন্য আল্লাহকে সেজদা করত তারা থেকে যাবে। তারা সে সময় সেজদা করতে চাইলে তাদের মেরুদণ্ডের হাড় শক্ত হয়ে একটি তক্তার মতো হয়ে যাবে। তাই তারা সেজদা করতে পারবে না (বুখারি : ৭৪৩৯)।’

আল্লাহর কাছে যাওয়ার মাধ্যম

সেজদার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি হয়। 

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হয়, যখন সিজদারত থাকে। অতএব তোমরা তখন অধিক দোয়া করতে থাকো (মুসলিম : ৪৮২)।’ 

হজরত রাবিআহ ইবনে কাব (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর সঙ্গে রাত যাপন করতাম। একদা আমি তাঁর অজু ও ইসতেঞ্জা করার জন্য পানি আনলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার কিছু চাওয়ার থাকলে চাইতে পারো।’ তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল। আমি আপনার সঙ্গে জান্নাতে থাকতে চাই।’ 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওটা ছাড়া আর কিছু চাও কি?’ আমি বললাম, ‘এটাই চাই।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাহলে বেশি বেশি সেজদার দ্বারা তুমি এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো (মুসলিম : ৪৮৯)।’ 

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার যেকোনো উম্মতকে কেয়ামতের দিন আমি চিনে নিতে পারব।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, ‘এত মানুষের মধ্যে আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন?’ তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি কোনো আস্তাবলে প্রবেশ করো, যেখানে নিছক কালো ঘোড়ার মধ্যে এমন সব ঘোড়াও থাকে, যেগুলোর হাত, পা ও মুখ ধবধবে সাদা, তবে কি তোমরা উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না?’ সাহাবিরা বললেন, ‘হ্যাঁ, পারব।’ তিনি বলেন, ‘ওই দিন সেজদার কারণে আমার উম্মতের চেহারা সাদা ধবধবে হবে, আর অজুর কারণে হাত- পা উজ্জ্বল সাদা হবে (মুসনাদে আহমাদ : ২৮৩৬)।’

শুকরিয়া আদায়ের জন্য সেজদা

যখন যেখানে আল্লাহর নেয়ামত অনুভূত হবে, সঙ্গে সঙ্গে শুকরিয়াস্বরূপ দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া সুন্নত। একাধিক হাদিসে রাসুল (সা.) শোকর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। 

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো নিদর্শন দেখবে তখন সেজদা করবে (আবু দাউদ : ১১৯৯)।’ 

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, ‘যখন নবীজি (সা.)- এর কাছে কোনো খুশির সংবাদ বা এমন কিছু পৌঁছত, যাতে তিনি সন্তুষ্ট হতেন, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে নামাজে সেজদায় পড়ে যেতেন (আবু দাউদ : ২৭৭৬)।’ শুধু একটি সেজদার মাধ্যমেও শুকরিয়া আদায় করা যায়, তখন তাকে সেজদায়ে শোকর বা শুকরিয়ার সেজদা বলা হবে। 

এ উভয় পদ্ধতিতে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা যায়। শুকরিয়ার নামাজের রাকাতের সংখ্যা নির্দিষ্ট বা স্বতন্ত্র কোনো নিয়ম নেই। তবে দুই রাকাতের কম করা যাবে না। অন্যান্য নফল নামাজের মতো করেই আদায় করতে হয়। 

আর শুধু সেজদায়ে শোকর আদায় করলে নামাজের তেলাওয়াতে সেজদার মতো কেবলামুখী হয়ে তাকবির দিয়ে সেজদা করা যাবে (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : ৭/১২৫)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বেশি বেশি তাঁর কুদরতি কদমে সেজদাবনত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্যলাভের তওফিক দান করুন।

/ডিএফ



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: