দেশজুড়ে রয়েছে চলনবিলের শুটকির সুনাম। বর্ষামৌসুম শেষে পানি কমতে থাকলে সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের চলনবিল ও হালতিবিল অধ্যুষিত নলডাঙ্গা, সিংড়া, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার ৪০টিরও বেশি স্থানে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুটকি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অন্যমত চেলা, চ্যাং, পুঁটি, টেংরা, বাতাসি, চাপিলা, খলশে, মলা, টাকি, গোচই, বাইম, শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈসহ মিঠা পানির বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মাছের শুঁটকি।
দেশি মাছের শুটকির স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণগতমান ভালো থাকায় বাণিজ্যিকভাবে ভারতে রফতানি হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশেও দিন দিন কদর বাড়ছে মিঠা পানির এসব শুঁটকির। কিন্তু সৈয়দপুরের আড়তদারদের সিন্ডিকেটে লোকসানের মুখে পরেছে এ অঞ্চলের শুটকি ব্যবসায়ীরা। বছর ২ আগে ভারতের ব্যবসায়ীরা সরাসরি তাদরে থেকে ন্যায্য দামে শুটকি কিনেলেও এখন তা সৈয়দপুর বাজার থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে যাচ্ছে ভারতে।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, সৈয়দপুরের আড়তদাররা ভারতীয়দের আমাদের কাছে আসতেই দেয় না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি ৩ কেজি পুঁটি মাছে ১ কেজি, ৪ কেজি চিংড়ি মাছে ১ কেজি, ৩ কেজি শোলমাছে ১ কেজি, ৪ কেজি মোলামাছে ১ কেজি এবং সাড়ে ৩ কেজি গুচি মাছে ১ কেজি করে শুটকি পাওয়া যায়। এরমধ্যে পুঁটিমাছের শুটকির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় মৎস্য বিভাগের হিসেব মতে, প্রতি ৩ দশমিক ৫ কেজি কাঁচা মাছে ১ কেজি শুঁটকি উৎপাদন হয়। যার গড় মূল্য সময় ভেদে ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা কেজি। অর্থাৎ প্রতি মণ শুটকির দাম ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পড়ে। এতে মোট উৎপাদিত শুটকির দাম দাঁড়ায় ১৭ থেকে ২০ কোটি টাকা। তবে, স্থানীয় শুটকি উৎপাদনকারীদের হিসেবে প্রতি মৌসুমে (সাত মাস) তারা ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন করেন।
নাটোর জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে জেলায় ৩৫০ মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য হিসেবে যার পরিমাণ ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
শুটকির চাতালে শ্রমিক আলেয়া ও মনোয়ার হোসেন জানায়, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একজন নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকা আর পুরুষ শ্রমিকরা পায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
শুটকি ব্যবসায়ী আলমঙ্গীর হোসেন জানান, বর্তমান সিংড়া মাছের আড়তে কাঁচা পুটি মাছ ৮০ থেকে ৯০ টাকা, চাঁদা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, খলিশা ৭০ থেকে ৮০ টাকা ও বেলে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ৪০ কেজি কাঁচা মাছ শুকালে ১৫ কেজি শুটকি মাছ হয়। প্রতি মণ শুঁটকি ১৬-১৭ হাজার টাকায় বিক্রি করলে কিছুটা লাভ হয়।
শুটকি উৎপাদনকারী শাহা-আলম বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে এসে শুটকি কিনেন। শুটকি পল্লির এসব চাতাল থেকে প্রতি মৌসুমে ২ শত ৩২ মেট্রিকটন দেশী প্রজাতি মাছের শুটকি উৎপাদন করা হয়, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে শুটকির পাইকারি বাজার সৈয়দপুর থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে এখন যাচ্ছে ভারতে।
আক্কাস আলী নামে শুঁটকি উৎপাদনকারী জানান, শুটকি তৈরিতে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে, অনেক সময় তাদের ব্যয় ফিরে পাওয়াই দায় হয়ে পড়ে। তার হাতে তৈরি শুঁটকিগুলো ভারতেও রপ্তানি হয়। বছর ২ আগে ভারতের ব্যবসায়ীরা সরাসরি তার কাছ থেকে ন্যায্য দামে শুটকি মাছ কিনেছে। কিন্তু সৈয়দপুরের আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে ভারতীয়দের আমাদের কাছে আসতেই দেয় না।
এব্যাপারে সিংড়া উপজেলা মৎস্য অফিসার শাহাদত হোসেন বলেন, চলনবিলের মিঠা পানি মাছ থেকে উৎপাদিত এখানকার শুটকির গুনগতমান ভালো এবং স্বাস্থ্য সম্মত। যারা শুটকি উৎপাদন করছেন আমরা তাদেরকে প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি।
এ বছর চলনবিলে বর্ষার পানি বিঘ্ন হওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম উৎপাদন হতে পারে। তবে যেহেতু শুটকির বড়-বাজার, সৈয়দপুর থেকে ভারতে এখানকার শুটকির চাহিদা রয়েছে সে ক্ষেত্রে শুটকির উৎপাদন কম হলেও উৎপাদনকারীরা লাভবান হবেন।
/এমএ/আরএ