দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা দূরীকরণের আমল

নূর মুহাম্মদ রাহমানী

ইসলামের আলো

মানবজীবনে মানসিক টেনশন বা দুশ্চিন্তা আসাটা খুবই স্বাভাবিক। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ যেন মানবজীবনের একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

2023-01-02T02:09:52+00:00
2023-01-02T02:09:52+00:00
 
  শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা দূরীকরণের আমল
নূর মুহাম্মদ রাহমানী
প্রকাশ: সোমবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৩, ২:০৯ এএম   (ভিজিট : ৮৫০)
মানবজীবনে মানসিক টেনশন বা দুশ্চিন্তা আসাটা খুবই স্বাভাবিক। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ যেন মানবজীবনের একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কখনো হাসি, কখনো কান্না-এভাবে জীবনের ভাঙাগড়ার খেলা সদা চলমান। এমন মানুষ পাওয়া কঠিন, যার কোনো দুশ্চিন্তা নেই, বিষণ্নতার সম্মুখীন হয় না। বুঝে নিতে হবে সুখ-দুঃখ মিলিয়েই মানুষের জীবন। পার্থিব জীবনে কষ্ট-ক্লেশ মানুষের অনিবার্য সঙ্গী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে’ (সুরা বালাদ : ৪)। 

তাই জীবনে চলার পথে কখনো দুঃখ-দুর্দশা আসতেই পারে। হতে পারে মানসিক টেনশন। এতে হতাশ হওয়া যাবে না। বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে প্রতিটি পরিস্থিতিকে জয় করে নিতে হবে। এমন কিছু আমল তুলে ধরা হলো, যার মাধ্যমে দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। 

তাকদিরের ওপর বিশ্বাস: ইসলাম তার অনুসারীদের তাকদিরের ওপর ঈমান রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। যখন একজন মানুষের নিশ্চিত বিশ্বাস থাকে যে, আমার ভাগ্য আল্লাহর হাতে। আমার জন্য যা উত্তম তিনি তা আমার সৃষ্টির পূর্বেই লিখে রেখেছেন। সে অনুসারেই দুনিয়ার জীবনে সুখ-দুঃখের সম্মুখীন হতে হয়। ভালো-মন্দ সব তাঁর পক্ষ থেকেই আসে। আসমানের ফয়সালায় যখন কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট হওয়া শেখে তখন সব রকম পেরেশানি, মানসিক চাপ খুব সহজে শেষ হয়ে যায়। তখন প্রতি মুহূর্তে সেভাবে এটাই আমার ভাগ্যে ছিল এবং এতেই আমার কল্যাণ। এই তাকদিরে বিশ্বাস রাখার মাধ্যমে মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটে। টেনশন ও পেরেশানির মধ্যেও এমন মানসিক প্রশান্তি অনুভব হয়, যা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদের ক্লেশ দিলে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার মঙ্গল চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই।’ (সুরা ইউনুস : ১০৭) 
 
নামাজের ব্যাপারে যত্নবান : যেকোনো বিপদ-মুসিবত বা পেরেশানির সময় নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন (আবু দাউদ : ১৩১৯)। সাহাবায়ে কেরামও এ আমলে অভ্যস্ত ছিলেন। ছোট থেকে ছোট কোনো বিষয়ের জন্যও তারা নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। এমনকি সামান্য জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও নামাজের মাধ্যমে সমাধা করতেন। 

বেশি বেশি ইস্তেগফার: মানসিক চাপ কমাতে ইস্তেগফারের জুড়ি নেই। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত দেবেন, তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে’ (সুরা নুহ : ৭১)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ (আবু দাউদ : ১৫২০)

অধিক হারে দরুদ পাঠ : দরুদ পাঠ আল্লাহ তায়ালার রহমত প্রাপ্তির বিশাল মাধ্যম। আত্মপ্রশান্তি লাভের সহজ উপায়। এটি এমন আমল, যা সর্বদা কবুল হয়। হজরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার ওপর অনেক বেশি দরুদ পাঠ করতে চাই। 
আপনি বলে দিন আমি দরুদে কতটুকু সময় দেব?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যতটুকু চাও!’ আমি বললাম, ‘এক-চতুর্থাংশ সময়?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যতটুকু চাও, যদি আরও বাড়াও তোমার জন্য ভালো।’ আমি বললাম, ‘অর্ধেক সময়?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যতটুকু সময় পড়তে পারো, যদি এর চেয়ে আরও সময় বাড়াও তোমার জন্য ভালো।’ আমি বললাম, ‘তাহলে সময়ের দুই-তৃতীয়াংশ?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যতটুকু চাও, যদি আরও বাড়াও তোমার জন্য ভালো।’ আমি বললাম, ‘সম্পূর্ণ সময় আমি আপনার ওপর দরুদ পাঠ করায় রত থাকব।’ তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে এখন হতে তোমার পেরেশানি দূর হওয়ার জন্য দরুদই যথেষ্ট এবং তোমার পাপের কাফফারার জন্যও দরুদই যথেষ্ট।’ (তিরমিজি : ২৪৫৭)

অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ 
ইসলামে পরামর্শের গুরুত্ব অনেক। আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব পরিহার করে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শভিত্তিক কাজ করা ইসলামের শিক্ষা। তবে পরামর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরামর্শ যথার্থ এবং বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য মানুষের সঙ্গে করা। পরামর্শের কারণে অভিজ্ঞ ও চিন্তাশীলদের চিন্তাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর অভিজ্ঞদের চিন্তার প্রভাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাও গভীর হয়, সমৃদ্ধ হয়। পেরেশানি, মানসিক টেনশন তো বহু দূরে পালায়।। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি পরামর্শ কামনা করে সে অকৃতকার্য হয় না।’ (তিরমিজি)

দোয়া করা 
মানসিক চাপ কমাতে নিয়ম করে দোয়া করা উচিত। কারণ দোয়া হলো ইবাদতের মূল। দোয়া করলে আল্লাহ খুশি হন। না করলে বরং অসন্তুষ্ট হন। তবে দোয়ার ক্ষেত্রে হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি এমন একটি দোয়া সম্পর্কে অবগত আছি, কোনো বিপদগ্রস্ত লোক তা পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা তার সেই বিপদ দূর করে দেন। সেটি হচ্ছে আমার ভাই ইউনুস (আ.)-এর দোয়া।’ দোয়াটি হলো-‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন’, অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিঃসন্দেহে আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (তিরমিজি : ৩৫০৫)

চিন্তা ও পেরেশানির সময় রাসুল (সা.) একটি বিশেষ দোয়া পড়তেন। দোয়াটি হলো-‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল’, অর্থাৎ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় চাচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে’ (আবু দাউদ : ১৫৫৭)। মহান আল্লাহ আমাদের আমল করে চিন্তামুক্ত থাকার তওফিক দান করুন। 



Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: