বিশ্ব ব্যাপী ইসলাম ধর্মের প্রচারে কাজ করে যাচ্ছে তাবলিগ জামাত। অন্যান্য আন্দোলনের মতো তাবলিগ জামাতও ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার অবদান। দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্র মাওলানা ইলিয়াছ আখতার কাসেমী কান্ধলভীর হাত ধরে (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তাবলিগ জামাত। দেওবন্দ মাদরাসার প্রথম ছাত্র শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দীর কাছে ১৯০৮ সালে বুখারি ও তিরমিজি পড়েন মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভী। তারপর ১৯১০ সালে উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর মাদরাসায় মাসিক ১৩ টাকা বেতনে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। সাহরানপুর মাদরাসায় তিনি ১০ বছর পাঠদান করেন হাদিসের কিতাব, তিরমিজি, মুয়াত্তা মালেক, মুস্তাদরাকে হাকেম; ফিকহের কিতাব কানযুদ্দাকায়েক, নুরুল আনওয়ার; আরবি সাহিত্যের কিতাব মাকামাতে হারিরি ও মানতেকের কিতাব কুতবি ইত্যাদি।
তাবলিগ জামাতের সূচনা হয় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার এলাকায়। প্রাচীনকালে অঞ্চলটি ছিল ‘মেও’ জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। বর্তমানে গোরগাঁও, আলোর, ভরতপুর ও মথুরার কিছু অংশ নিয়ে মেওয়াত এলাকা বিস্তৃত। ‘তারিখে ফিরোজশাহী’তে জানা যায়, আর্যদের আগমনের বহু পূর্ব থেকে মেও গোষ্ঠীরা এই এলাকায় বসবাস করত। তাদের আচার-আচরণ ছিল বহু ক্ষেত্রে আরব জাহেলিয়াতের কাছাকাছি। দিল্লির সুলতানি আমলেও মেওয়াতিরা বনজঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে লুটপাট করত। ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন মেওয়াতি দস্যুদের শায়েস্তা করতে এক বড় অভিযান পরিচালনা করেন। এমন একটি এলাকা থেকেই তাবলিগ জামাতের বিস্ময়কর সূচনা হয়। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বড় বোনের স্বামী মির্জা ইলাহি বখশ ছিলেন ব্রিটিশদের আস্থাভাজন।
তিনি নিজামুদ্দিন দরগাহ এলাকায় নির্মাণ করেছিলেন তার বাংলোবাড়ি এবং একটি মসজিদ। বাংলোবাড়ির নামানুসারে মসজিদের নাম হয় বাংলাওয়ালি মসজিদ, যা বর্তমানে ‘নিজামুদ্দিন তাবলিগ মার্কাজ মসজিদ’ নামে পরিচিত। মির্জা ইলাহি বখশের পুত্রদের গৃহশিক্ষক এবং বাংলাওয়ালি মসজিদে ইমাম হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভীর বাবা মাওলানা ইসমাইল। ১৯২০ সালে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল মৃত্যুবরণ করলে শূন্য পদের জন্য এলাকাবাসী পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভীর কথা চিন্তা করেন। এলাকাবাসীর অব্যাহত তাগিদে সাহরানপুর মাদরাসা থেকে এক বছরের ছুটি নিয়ে যান নিজামুদ্দিন মসজিদ-মাদরাসার দায়িত্ব পালনে।
তাবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভীর পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। মূলত পাঁচ বছর নিজামুদ্দিন মাদরাসা পরিচালনা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রতিফল হিসেবে জন্মলাভ করে তাবলিগ জামাত। মেওয়াতের লোকজন ধর্মানুরাগী হলেও ছিল ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে চরম উদাসীন, জাতিগতভাবে অশিক্ষিত ও মূর্খ, দুর্বল বিশ্বাসী ও কুসংস্কারপ্রিয়। জাতির শেকড় থেকে শিখর সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করেন মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভী। এমতাবস্থায় ১৯২৬ সালে তিনি হজের সফরে যান। হজের এ সফরেই ভাবনার ঘোরে অন্তরে অংকুরিত হয় তাবলিগ জামাতের স্বপ্নের বীজ। হজ শেষে মদিনায় নবীজির রওজার সামনে মুরাকাবায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ‘কাশফ’ হয় প্রচলিত তাবলিগ জামাতের সুরত। ১৯২৭ সালে হজ থেকে ফিরে সাহরানপুর মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা খলিল আহমাদ সাহরানপুরি, শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী ও প্রধান মুফতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী প্রমুখ আলেমের বৈঠকে উপস্থাপন করেন কাশফের বিষয়। তাদের সম্মতি নিয়ে এলাকায় ফিরে শুরু করেন তাবলিগ ও ধর্ম প্রচারের কাজ।
প্রায় ১০ বছর এলাকায় তাবলিগের কাজের অভিজ্ঞতার পর ১৯৩৩ সালে হজের সফরে যান মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভী। হজ শেষে ২৭ এপ্রিল মদিনায় নবীজির রওজায় পুনরায় মোরাকায় আত্মসমাহিত হন। তখন তাবলিগ জামাতের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আরও গভীর বোধ অর্জন করেন এবং নতুন করে বিন্যস্ত ও পরিমার্জনা করেন। তখন তার নির্দেশে ছাত্র মাওলানা ইহতিশামুল হাসান কান্ধলভী রচনা করেন তাবলিগি নেসাব, তাবলিগি উসুল ও ছয় সিফাত, পুস্তিকা ওয়াহেদ ইলাজ ইত্যাদি। হজ থেকে ফিরে মেওয়াতের লোকদের জামাত বানিয়ে মেওয়াতের বাইরে বিভিন্ন জেলা ও প্রদেশের মাদরাসা, খানকা, উলামা-মাশায়েখদের এলাকায় পাঠানো শুরু করেন।
অল্প সময়ের ব্যবধানেই তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম মেওয়াতের মহল্লা থেকে ভারতের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাসে তাবলিগ জামাতের প্রথম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় উত্তর প্রদেশের গোরগাঁও জেলায় মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার প্রাঙ্গণে। এ ইজতেমায় জুমার নামাজের ইমামতি ও বয়ান করেন দেওবন্দ মাদরাসায় মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভীর দাওরায়ে হাদিসের সহপাঠী মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী।
মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর সঙ্গে মাওলানা ইলিয়াছ কান্ধলভীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মাওলানা থানবীর নির্দেশে বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ফরিদপুরী তার ছাত্র মাওলানা আবদুল আজিজকে দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে পাঠান। চার মাস প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পর লালবাগ কেল্লার পশ্চিমে খান মুহাম্মদ মৃধা মসজিদে স্থাপন করেন তাবলিগ জামাতের অস্থায়ী কেন্দ্র। তারপর রমনা পার্কসংলগ্ন নবাবি আমলে নির্মিত মালওয়ালি মসজিদে (বর্তমান কাকরাইল মারকাজ মসজিদ) স্থাপিত হয় স্থায়ী কার্যালয়। দুই বছর পর ১৯৪৬ সালে ঢাকা সফরে আসেন তৎকালীন প্রধান জিম্মাদার মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী। সে বছরই কাকরাইল মসজিদে হয় বাংলাদেশের প্রথম ইজতেমা। ১৯৬৭ সালের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে বিশাল ময়দানে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টঙ্গী ময়দানের ১৬০ একর জমি তাবলিগ জামাতের নামে বরাদ্দ দেন। সে ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা।