বাংলাদেশে ব্যবসায় দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। তার সঙ্গে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, ঋণপ্রাপ্তির অপর্যাপ্ততা ও অদক্ষ প্রশাসন। এসব সমস্যার সঙ্গে সাম্প্রতিককালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও অস্থায়ী নীতিসহ নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের ব্যবসার পরিস্থিতি অনিশ্চিতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।
সিপিডি এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) করা ‘বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ ২০২২ উদ্যোক্তা জরিপের’ ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য উঠে আসে। রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৭৪ জন পদস্থ কর্মকর্তা গত বছরের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে করা এ মতামত জরিপে অংশ নেন। সেই হিসেবে এটি জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ নয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৪.৬ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন ব্যবসা সম্প্রসারণ করার অন্যতম প্রধান বাধা দুর্নীতি। এ ছাড়া ৪৪.৬ শতাংশ মনে করছেন ব্যবসায় আরেকটি বাধা অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল না পাওয়া। ৪৩.১ শতাংশ বলছেন আমলাতান্ত্রিক
জটিলতার কারণে তারা ব্যবসায় সুফল পাচ্ছেন না। ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়িক লাইসেন্স নিতে, ৪৯ শতাংশ গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ নিতে এবং ৭৫ শতাংশ কর্মকর্তা আমদানি-রফতানিতে দুর্নীতির কথা বলেছেন। ৩৮.৫ শতাংশ বলছেন মূল্যস্ফীতির কারণে তারা ব্যবসায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
সিডিপি বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের অগ্রগতি দেখা যায়নি। হয় এটি স্থবির ছিল, নতুবা আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সমস্যাযুক্ত কারণ হিসেবে ‘দুর্নীতি’ এখনও রয়েছে।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্নীতির পাশাপাশি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ব্যবসাকে আরও সমস্যায় ফেলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে বৈদেশিক মুদ্রার উত্থান-পতন, আমলাতন্ত্র ও মূল্যস্ফীতি। আর বড় ব্যবসায়ীদের জন্য এসবের পাশাপাশি অবকাঠামোর অপ্রতুলতা সমস্যার সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির কারণে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, সেবার মূল্যও অনেকখানি বেড়ে যায়। এ মূল্যের খানিকটা সাধারণ মানুষেরই ওপর পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে শুধু ব্যবসার পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপেশাদার আচরণ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলেও তিনি জানান।
কোন কোন খাতে দুর্নীতি হচ্ছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা, সেটি সব ধরনের ব্যবসায়ী বলেছেন। যেসব খাত এসেছে; তার মধ্যে ৪৮ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন কর দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি, ৫৪ শতাংশ বলছেন লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে; গ্যাস, বিদ্যুৎ নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির কথা বলছেন ৪৯ শতাংশ এবং আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে দুর্নীতির কথা বলছেন ৭৫ শতাংশ ব্যবসায়ী।
গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ পায় না। এ ক্ষেত্রে সুদের হার কমিয়ে দেওয়া দরকার। পুঁজিবাজারে আগের মতোই দুর্বলতা রয়েছে। আর্থিক খাতে সুশাসন আনার ক্ষেত্রে সরকার যে আশ্বাস দিয়েছে, বিশেষ করে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফের) সঙ্গে সরকার সুশাসনের যে কথা দিয়েছে সেখান থেকে কাজ শুরু হতে পারে। সেখানে আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ঋণখেলাপিদের কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির এ গবেষণা পরিচালক বলেন, যখন কোনো প্রকল্প নেওয়া হয় তখন ওই প্রকল্পের প্রস্তাবনায় প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ফলাফল কী হবে সে সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেই ফলাফল অর্জিত হয় না। কোন প্রকল্প প্রয়োজনী কোনটি অপ্রয়োজনীয় সে ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করতে হবে আগে এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে কী না সেটির মূল্যায়ন কী হলো। ইতিপূর্বে বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৃত্তাকার রেলপথসহ আরও কিছু প্রকল্প এখনকার বিচারে আমি বলব তা শুরু করা উচিত নয়। এ মুহূর্তে যেহেতু বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি রয়েছে এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেহেতু ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে আর ঋণগুলো যদি সহজ শর্তে না হয় তার একটা বড় দায় নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সারা বিশ^ এখন একটি অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ। যার মধ্যে খাদ্য ও জ্বালানি সমস্যা, মুদ্রাস্ফীতি, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তার পাশাপাশি বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দার দিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মন্দাভাব থাকবে। এটি থেকে উত্তরণ হচ্ছে না।
তিনি বলেন, এসব কারণে বাংলাদেশের মতো দেশ হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ ওই সব মূল্যস্ফীতির কারণে হাবুডুবু খাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যবসায়ীরা এক ধরনের চাপে রয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত যে জরিপকাজ হয়েছে; ওই সময়ের পরে আগস্ট, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে বেশ কিছু নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। যার চাপ ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে, মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমানের যে চেষ্টা রয়েছে, তা আরও বাড়বে। এর পাশাপাশি রফতানিকারক শিল্পগুলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।
ফাহমিদা আরও বলেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে রফতানি সক্ষমতা কমে এলে বড় একটি প্রভাব পড়বে রফতানি খাতে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এমনিতেই কমার দিকে, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জরিপে যেসব সূচকের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে প্রথম সূচক রয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, সেবার মূল্যও অনেকখানি বেড়ে যায়। দুর্নীতি ব্যবসার পরিবেশ ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।