অতিথিপরায়ণতা একটি মহৎ গুণ। মেহমানদারির বিশেষ এক ফজিলত বর্ণনা করে রাসুল (সা.) পবিত্র হাদিসে বলেছেন, ‘তোমরা দয়াময় রহমানের ইবাদত করো, মানুষকে খাবার খাওয়াও এবং সালামের অধিক প্রচলন ঘটাও, তবেই নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে’ (তিরমিজি : ১৮৫৫)। অপর এক হাদিসে মেহমানদারি করা অর্থাৎ অপরকে খাদ্য খাওয়ানো ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম একটি নেক আমল বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞেস করল, ইসলামে কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, ‘তুমি অপরকে খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেবে’ (বুখারি : ১২)। এ হাদিসে রাতের আঁধারে ঘুম থেকে ওঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করাকে ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম আমল বলা হয়নি। সর্বোত্তম আমল বলা হয়নি প্রতিদিন নফল রোজা পালন করাকে। বরং এমন দুটি কাজকে ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম আমল বলা হয়েছে, যেটা পালন করা একেবারেই সহজসাধ্য ব্যাপার। আর তা হচ্ছে-ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ানো এবং একে অপরকে সালাম প্রদান করা।
আখেরাতে যারা চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতের অধিকারী হবেন, দুনিয়াতে তাদের মহৎ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তারা অতিথিপরায়ণ হবেন এবং দুর্বল, নিঃস্ব-অসহায়, অনাহারীকে নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে খাবার খাওয়াবেন। কিন্তু আমরা অনেকেই দুর্বল, নিঃস্ব-অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অথবা সমাজে যশ-খ্যাতি অর্জনের লক্ষ্যে। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, অনাহারীদের আহারের ব্যবস্থা করা যদি হয় নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে, তবে শত শত অনাহারীকে খাদ্যদানে কোনোই ফায়দা হাসিল হবে না। এ জন্য ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে নয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা জান্নাতি হবে তারা খাদ্যের প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাবার দান করে এবং তারা বলে, শুধু আল্লাহর সস্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদের খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না, চাই না কোনো কৃতজ্ঞতাও।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)
মেহমানদারি করা যদিও ইসলামের মধ্যে সর্বোত্তম নেক আমল বলা হয়েছে, তবুও আমরা অনেকেই দুনিয়ার সাময়িক আর্থিক লোকসানের কথা ভেবে আখেরাতের চিরস্থায়ী লাভের কথা ভুলে গিয়ে মেহমানদারি করতে খুবই কৃপণতা ও কুণ্ঠাবোধ করি। অথচ আল্লাহ যাদের কল্যাণ চান, তাদের ঘরে একজন মেহমান পাঠিয়ে দেন। সুতরাং যে ব্যক্তি চায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে, সে যেন মেহমানকে সমাদর করার মাধ্যমে সন্তুষ্ট রাখে। কেননা মেহমানের সন্তুষ্টি অর্জনই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নামান্তর। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং আখেরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে’ (বুখারি : ৬০১৮)। এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ওপর এবং আখেরাত দিনের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হলে অবশ্যই মেহমানকে কদর করতে হবে।
মেহমানকে দুভাবে সম্মানিত করা যায়। সুন্দর রুচিশীল খাবার মেহমানের সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এবং মেহমানের সঙ্গে সুন্দর আচার-আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে। এই দুটির যেকোনো একটির অভাব হলে মেহমানদারির মর্যাদা ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মেজবানের উচিত, মেহমানের হক আদায় করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা। মেজবানের ওপর মেহমানের হক সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর এবং শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে তার প্রাপ্যের বিষয়ে। জিজ্ঞেস করা হলো, মেহমানের প্রাপ্য কী, হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, মেহমানের প্রাপ্য হচ্ছে এক দিন একরাত ভালোভাবে মেহমানদারি করা আর তিন দিন হলে সাধারণ মেহমানদারি করা, আর তার চেয়েও অধিক হলে মেহমানের প্রতি দয়া করা।’ (বুখারি : ৬০১৯)
ইসলামের সোনালি যুগের সোনার মানুষ সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে মেহমানদের সমাদর করতেন এবং কীভাবে মেহমানের হক আদায় করতেন, সে ব্যাপারে একটি চমৎকার ঘটনা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক লোক নবীজির (সা.) খেদমতে এলো। অতঃপর রাসুল (সা.) তাঁর স্ত্রীদের কাছে খাদ্যের জন্য একজন লোক পাঠালেন। তাঁরা জানালেন, আমাদের কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন রাসুল (সা.) বললেন, কে আছো যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সঙ্গে খাওয়াতে পারো? তখন এক আনসারি সাহাবি (আবু তালহা রা.) বললেন, আমি আছি ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ বলে তিনি মেহমানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসুল (সা.)-এর মেহমানকে যথাযথ সম্মান করো। স্ত্রী বললেন, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসারি সাহাবি বললেন, তুমি আহার প্রস্তুত কর এবং বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদের ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল তা মেহমানের সামনে উপস্থিত করল। বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মতো শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে লাগলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। মেহমানকে সন্তুষ্ট রাখতে তাঁরা উভয়েই সারারাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলেন, তখন রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কা- দেখে খুশি হয়েছেন এবং এই আয়াত নাজিল করেছেন-‘তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদের অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।’ (বুখারি : ৩৭৯৮)
এ ঘটনায় মেহমানকে যথাযথভাবে সম্মান ও সমাদর করার কারণে আল্লাহ তায়ালা আবু তালহা (রা.) ও তাঁর স্ত্রীর প্রশংসায় কুরআনুল করিমে একটি আয়াত নাজিল করে দিয়েছেন। আমরাও যদি উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে মেহমানকে খুশি রাখতে পারি, তাহলে আমরাও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করতে পারব।
পরিশেষে মেহমানের জন্য কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো-মেহমান যেন খাদ্যের অযাচিত ভুলত্রুটি ধরার পেছনে না পড়ে মেজবানের প্রশংসায় সর্বদায় যেন পঞ্চমুখ থাকে এবং মেজবানের সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে। সর্বশেষ মেহমানের উচিত মেজবানকে শুনিয়ে শুনিয়ে যেন মন খুলে এই বলে দোয়া বলে, ‘হে আল্লাহ! যে আমার খাবারের ব্যবস্থা করল তুমি তার খাদ্যের ব্যবস্থা করো। আর যে আমাকে পান করাল তুমিও তাকে পান করাও।’ (মুসলিম : ৫২৫৭)