পৃথিবীতে যে প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, তা খুবই সীমিত। তেল-গ্যাস-কয়লা এগুলো অনবায়নযোগ্য। এগুলো ইচ্ছা করলেই আবারও নতুন করে সৃষ্টি করা যায় না। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের তালিকায় তেল নেই। তবে প্রাকৃতিকভাবে না থাকলেও বাংলাদেশের পোড়া তেলের বায়োডিজেল দিয়ে চলছে ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ার মানুষের গাড়ির চাকা। সেই ফেলনা তেল থেকে আসছে এখন বৈদেশিক মুদ্রা। তাই পোড়া তেলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কালো সোনা’।
বায়োডিজেল হচ্ছে এক প্রকার জ্বালানি, যা গাছপালা বা প্রাণীর ফ্যাটি অ্যাসিড এস্টার থেকে পাওয়া যায়। সাধারণত প্রাণিজ লিপিড অথবা উদ্ভিজ্জ তেলের সঙ্গে অ্যালকোহলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন মিথাইল, ইথাইল বা প্রোপাইল এস্টার থেকে এটি উৎপাদন করা যায়। বায়োডিজেলকে সরাসরি বা ডিজেল জ্বালানির সঙ্গে মিশ্রণের মাধ্যমে জ্বালানি তেল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বায়োডিজেল এবং ডিজেল জ্বালানির মিশ্রণকে হিটিং অয়েল হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এই মিশ্রিত জ্বালানি তেলকে যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়।
আমাদের দেশে বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁয় প্রতি মাসে ১ হাজার টন পোড়া ভোজ্য তেল জমে। হোটেলের এই পোড়া তেল যে শুধু রফতানিই হচ্ছে তা নয়, দেশেও এক তরুণ উদ্যোক্তা পোড়া তেল থেকে বায়োডিজেল তৈরির কারখানা গড়েছেন। বৃহস্পতিবার সময়ের আলোতে একটি প্রতিবেদন এসেছে, আবদুল্লাহ আল হামিদের নেতৃত্বে পাঁচ উদ্যমী তরুণ গড়ে তুলেছেন বায়োটেক এনার্জি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কারখানা থেকে এখন প্রতিদিন ১০ টন বায়োডিজেল উৎপাদন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। দেশের এই প্রতিষ্ঠান এবং রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মুনজার বাংলা প্রাইভেট লিমিটেড হোটেল থেকে পোড়া তেল সংগ্রহ করে একদিকে পরিবেশ ও মানব শরীরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করছে, অন্যদিকে ফেলে দেওয়া তেল থেকে দেশকে এনে দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।
জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান দুটি পদার্থ কয়লা আর ডিজেল। এ দুটি পদার্থের ব্যবহার এখন পৃথিবীতে সব থেকে বেশি। ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসারণ বেড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। কার্বনের এই নিঃসারণ যদি কমিয়ে আনা না যায় তা হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে একবার করে ৩০ কোটি মানুষ বসবাসের বিশাল এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে। আমরা জানি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে জলবায়ু। দক্ষিণ ও উত্তর মেরুর বরফ গলে সমুদ্রের পানির পরিমাণও গেছে বেড়ে। তার ওপর আবার বহুগুণ বেশি দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব কারণ চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় শিল্পোন্নত দেশগুলো মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করছে কয়লা, ডিজেল।
এতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উদগিরণ বেড়ে গেছে ভয়াবহ রকমভাবে। এই কার্বন-ডাই-অক্সাইডই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়িয়ে দিয়েছে, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত ওজোন স্তরকে। তবে প্রাকৃতিক ডিজেলের বদলে এই বায়োডিজেলে গাড়ি চালালে ৯০ ভাগ কার্বন নিঃসারণ কম হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বায়োডিজেলে মাত্র ১০ ভাগ কার্বন নিঃসারণ হয় বলে জানা গেছে।
হোটেলে রান্নার পোড়া ভোজ্য তেল স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। যুগ যুগ ধরে এসব পোড়া তেল ফেলে দেওয়া হতো হোটেলের আশপাশের খোলা জায়গায় অথবা ডোবা, নালা, খালে। এভাবে ফেলে দেওয়া এ তেল মানব শরীর ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াত। এর প্রভাবে মাটি ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ত। তাই পোড়া তেলকে বায়োডিজেলে রূপান্তরের বিষয়টি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে বলেই আমরা
মনে করি।