একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের বিদায় লগ্নে। শেষের বেলায় এসে দ্রুততায় ছুটছে। যেন চলে যাওয়ার মধ্যেই তার ইহলীলা সাঙ্গ হবে। চলে তো তাকে যেতেই হবে। কিন্তু পেছনে ফেলে রেখে যাচ্ছে ৩৬৫ দিনের নানা ঘটনা, ঘাত-প্রতিঘাত, ত্রাস-সন্ত্রাস, জয়-পরাজয়, আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, সুখ-সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, উন্নয়নের দ্যোতনা, শোক-অশোক আর নানা বিচিত্র বিষয়াবলী। যা বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন সময়ের বছর। এই সময়ের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে জাতি হিসেবে অস্তিত্ব, পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত থাকা না থাকা, পতাকা খামছে ধরা না ধরার শক্তিমত্তা, স্বাধীনতার ফিরে পাওয়া অর্জনের সুরক্ষা হবে কি হবে না সেসব। বাঙালি জাতির জন্য ভাবাবেগের বছর নয়, বরং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং অর্জিত সুফল ধরে রাখার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বছর।
ব্যক্তিবিশেষের প্রতি ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে অঘটন ঘটানোর মধ্যে যে ভুল সিদ্ধান্ত থাকতে পারে, তা অবশ্যই যাচাই করা না গেলে বড় বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ২০২৪ সাল বাঙালির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বছর বৈকি। এই বছরই তাকে নির্ধারণ করতে হবে সে কি পঁচাত্তর পরবর্তী পাকিস্তানি দাসত্ব মানসিকতায় দেশকে নিয়ে যাবে, নাকি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত তার প্রাণপ্রিয় স্বদেশকে বিশ্ব দরবারে আরও সগৌরবে দাঁড় করিয়ে প্রমাণ করে দেবে, বাঙালি বীরের জাতি। এই বাঙালি তো একাত্তর সালে গেয়েছিল এবং আজও গেয়ে ওঠে, ‘বাংলার প্রতি ঘর ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে/আমাদের রক্ত টগবগ জ্বলছে মুক্তির দীপ্ত তারুণ্যে/আর নাই ভয়/হবে হবে জয়।’ সেই বাঙালি আবার পরাধীনতার পথ বেছে নেবে কি না, এমন ভাবনা সঙ্গত কারণেই আসে। কারণ বাঙালিকে পরাধীন সময়ে ফিরিয়ে নিতে কত ষড়যন্ত্র, কত কুটিলতার জাল বোনা হচ্ছে, অর্থকড়ি বিনিয়োগ করছে পরাজিতদের সংস্থাগুলো। সেই গুপ্তহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশকে যারা ধ্বংস এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চেয়েছিল, গণহত্যাকারীদের ক্ষমতার অংশীদার করেছিল, তাদের প্রতিহত করার বছর বৈকি ২০২৪ সাল। অবশ্য বিদায়ি বছরের রেশ ধরেই এই নববর্ষের আগমন, বিকাশ, বিস্তার ঘটে। ২০২৩ সাল পূর্ববর্তী তিন বছরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ছিল বলা যায়। কিন্তু আসন্ন বছর কি শান্তির বার্তা বয়ে আনবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নির্বাচনি বছর। সুতরাং একই অঙ্গে তার অনেক রূপ ঝলকাবেই। শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু নির্বাচন হোক দেশে এটা সবারই কাম্য।
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষপ্রান্তে এসে প্রশ্ন জাগবেই, তা হলে কতদূর এগোল বাংলাদেশ? স্বাধীনতার ৫২ বছর পার হয়ে দেশটি আজ কোন পথে? পেছন পানে তাকালে স্পষ্ট হবে সাদৃশ্য-বৈসদৃশ্য নানা দৃশ্যপট। ১৭ কোটি মানুষের দেশে বর্ষশেষে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে আরও প্রশ্ন আসবেই, বিদায়ের পথের বছরটি কেমন কেটে গেল, অর্থাৎ ২০২৩ সাল। রাত পোহালে কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্ত রেখার ওপারে, ২০২৩ সালের শেষ সূর্যাস্তের আলো কালের অতলে নিভে যাওয়ার আগে এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসবেই। চিরতরে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। বাঙালি জাতি সত্যিই পার করল আরও একটি শুভাশুভ বছর। শেষ সূর্যাস্তের আলোর সামনে দাঁড়িয়ে, কুয়াশার চাদর জড়িয়ে থাকা নিসর্গের দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলা যাবে, তেমন মন্দ কাটেনি। ভালো-মন্দের মাঝে ভালোর চেহারাটা পরিষ্কার দেখা গেছে।
এই ভালো-মন্দের দিনগুলো, তার বিশদ বিবরণ বিবৃত হয়ে আসে সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় আর টিভির ফুটেজে। মানুষের মনেও তা দাগ কেটে আছে। বছরের ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই মনে দোলাচল জাগবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও/তারই রথ নিত্যই উধাও।’ প্রশ্নটি সঙ্গত। কালের যাত্রা পথেই মানুষের নিত্যদিনের গতিবিধি। মানুষ পৃথিবীতে আসে অতি অল্প দিনের জন্য পঞ্চাশ, ষাট বড় জোর সত্তর-আশি বছর তার মেয়াদ।
বাংলাদেশে অবশ্য গড় আয়ু বেড়েছে এই সরকারের আমলে, সত্তরোর্ধ। কিন্তু মানুষ এটুকু সময়ের মধ্যেই তার চারপাশে তুমুল তোলপাড়ের সৃষ্টি করে। সামান্যটুকু করতে গিয়েও নানা ঝঞ্ঝাট বাধায়। লক্ষণীয় যে, মানুষের গতিবিধি, ক্রিয়াকলাপ সবই অতিমাত্রায় সশব্দ। আস্তে-ধীরে, আলগোছে কিছুই করতে পারে না। জলস্রোতের মধ্যে যেমন একটা কলকল রব, জনস্রোতের মুখেও সারাক্ষণ তেমনি একটা কলকণ্ঠ কলরব। কিন্তু এই যে নিরবধিকাল; বিশ্ব সৃষ্টির প্রথমাবধি নিরন্তর চলে আসছে, তার মুখে ‘টু’ শব্দটি নেই। স্বল্পায়ু মনুষ্য নামক জীবটির লম্ফঝম্ফ, তাজ্জব কর্মকাণ্ড দেখে অমিতায়ু মহাকাল নিশ্চয় মনে মনে হাসেন।
এটা সত্য এবং বাস্তব যে, মানব সমাজ আজ এক নতুন যুগের সম্মুখীন। প্রযুক্তির বিকাশ এবং তার ব্যবহার পুরোনো ধ্যান-ধারণাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোধশূন্য দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন নিরঙ্কুশ মানুষ নির্দ্বিধায় যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত। সত্য বলতে কি, মানব সভ্যতা আজ বিপন্ন। পরাশক্তিগুলোর আচরণ, দেশে-বিদেশে তাদের অপতৎপরতা বিশ্বকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সভ্যতাকে বর্বরতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য অনেক দেশ প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। কালের গতি অবিরাম। সে চলছে এগিয়ে, মানুষ পড়ছে পিছিয়ে।
আশা করা গিয়েছিল, কালের অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের ক্রমোন্নতি হবে; সভ্য মানুষ সভ্যতার হবে। তা হয়নি, বরং বিপরীতটাই হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসবাদীরা মানুষ শিকার করে বেড়াচ্ছে। যারা তালেবান, আইএস সৃষ্টি করেছে, তারা বিশ্ব শান্তিকে তছনছ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর যে হালহকিকত, তা ক্রমশ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। যদিও তাদের নির্মূলে সর্বক্ষণ তৎপরতা চলছে। দেশে দেশে রাজনীতি কিংবা রাজ-দুর্নীতিও বলা যায়, এসবের জন্য বহুলাংশে দায়ী। মানুষের ওপর দুর্ব্যবহার মানুষই করছে। সোজা কথায় মানুষের মানবাধিকার মানুষই হরণ করছে। মানুষ মানুষের কি দশাই করেছে, ভাবলে দুঃখ, কষ্ট, বেদনার অবধি থাকে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের ধকলে বাংলাদেশও পড়েছে। বিদায়ি বছরে প্রবল বর্ষণ আর প্রবল খরা বুঝিয়ে দিয়েছে, সামনে আরও ভয়াবহ দিন আসছে। পরিবেশ দূষণের নিয়ন্ত্রণ সমস্যা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। সমস্যাটি প্রধানত আধুনিক যন্ত্রযুগের অবদান। দূষণ প্রতিরোধের সামর্থ্য উন্নত দেশগুলোর হয়তো আছে। অনুন্নত দেশে জঞ্জাল এমনিতেই জমে ওঠে, আবর্জনা বর্জন করতে তারা জানে না। তার ওপরে আজকের যান্ত্রিক দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা তাদের সাধ্যের অতীত। নিউক্লিয়ার শক্তিবর্গ থেকে থেকে নিউক্লিয়ার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে সারা বিশ্বময় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ফলে পরিবর্তন ঘটছে জলবায়ুতে। বিজ্ঞানী বোস কণার আবিষ্কারক সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলতেন, ‘এ রকম চলতে থাকলে বিশে^র ঋতুগুলো বদলে যাবে; বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা বাড়বে।’ তার নমুনা তো দেখা যাচ্ছে। শীত-গ্রীষ্ম বৃষ্টিপাতের মাত্রায় অনেক তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত মানুষের চরিত্র দূষণ। পরাশক্তিদের দেশগুলোর নেতাদের চরিত্র দূষণের মাত্রা বেড়েছে। মানবচরিত্র দূষিত হয়েছে বলেই পরিবেশ আজ কলুষিত। মনুষ্যসৃষ্ট এ সমস্যার প্রকোপ খোদ বাংলাদেশেও মেলে। সুনীতি-দুর্নীতি এবং সততা-অসততার পার্থক্যও লোকে ভুলে গেছে বলে মনে হয়। সমাজের বৃহত্তর মঙ্গল বিবেচনা হতে বাদ দিয়ে এখন প্রত্যেকে প্রত্যেকের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের জন্য হন্যে হয়ে উঠেছে। মূর্খতা, অজ্ঞতা, অন্ধতা, গোষ্ঠী মনোবৃত্তি প্রভৃতি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় রাজনীতিকে বারবার একই শনিচক্রের মধ্যে ঘোরানো সম্ভব।
এদের কারণে দেশের সমস্যার সংখ্যা ও জটিলতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষ ভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হচ্ছে। ঘটছে সাংস্কৃতিক অধঃপতন। সাধারণ ক্লাসিক্যাল অপরাধ বৃদ্ধির নেপথ্যে ক্রিয়া করছে এই নীতিহীনতা। পাশাপাশি ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে অবিরত। এরা জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটাতে সহায়ক। এরাও সাম্প্রতিককালে মানুষ হত্যায় নেমেছিল। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, রাজনীতির নীতিগত আদর্শ হচ্ছে, মানুষ যেখানে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেখানে তাকে আপন অধিকারে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। কার্যত পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক জান্তা ও একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং ধর্ম ব্যবসায়ীরা মিলে দেশকে ধ্বংসের পথে নিতে চায়। কথিত মানুষরা যে কতখানি পশুর আচরণ করতে পারে, তার নতুন নতুন পথ, নিত্য উন্মুক্ত করছে। তারা পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা, জীবন্ত দগ্ধ করা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সবই চালিয়েছে। নৃশংসতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিপনা, ধ্বংসযজ্ঞের নারকীয় পথ অবলম্বন করে এক ভয়াবহ অবস্থার তৈরি করেছিল।
নববর্ষের এই সূচনালগ্নে বলা যায়, জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আত্মপ্রবঞ্চনা, অগণতান্ত্রিক ও পশ্চাৎমুখী প্রবণতার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ জরুরি। নির্বাচন বানচালের সব ষড়যন্ত্রের হোক অবসান। ত্রাস-সন্ত্রাসের দিন যেন আর না আসে ফিরে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে। নির্বাচনি জয়-পরাজয়কে মেনে নেওয়ার জন্য জনগণকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে দলগুলোর ওপর।
আজ ১ জানুয়ারি। খিস্ট্রীয় নববর্ষ। উৎসবে মেতে উঠবে বিশ্ব সব মানুষ। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ যেন চিরায়ত হয়, সেই কামনাও করা হবে। বছরের শেষ পাদে এসে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথকে। তার ‘বর্ষশেষ’ কবিতার চরণ স্মরণ করা যায় এই বেলায়, ‘আজি এই বছরের শেষ আয়োজন মৃত্যু, তুমি ঘুচাও গুণ্ঠন/ কত কি গিয়েছে ঝরে জানি জানি, কত স্নেহ প্রীতি/ নিবায়ে গিয়েছে দ্বীপ, রাখে না স্মৃতি।’
মহাপরিচালক, পিআইবি