ছোট্ট ভূখণ্ডে অত্যধিক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, ঘুষ-দুর্নীতি, অদক্ষ বন্দর, যোগাযোগব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্যা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে কয়টি খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-এর মধ্যে বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে। প্রবাসীরা যে কেবল দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করছেন তা নয়, একই সঙ্গে দেশে থাকা তাদের পরিবার-পরিজনকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা দেশের মূল অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের একটি।
মূলত জমি বিক্রি কিংবা ঋণ করে দালাল এবং বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাচ্ছেন বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক। এই শ্রমিকদের বেশির ভাগের কোনো ধরনের কাজের দক্ষতা নেই। ফলে তাদের কম মজুরি ও নিচু পদে কাজ করতে হয়। আবার কখনো চাকরিচ্যুতি হওয়াসহ নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বাংলাদেশ আধাদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে। রোববার সময়ের আলো থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালে যারা কর্মের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন, তাদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের কিছু বেশি স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের একটা বড় অংশ অদক্ষ এবং আধাদক্ষ। এই তথ্য আমাদের শঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে বারবার বলা হচ্ছে। দক্ষতা বাড়াতে ২০১১ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালাও করা হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে প্রবাসে শ্রমিক নিয়োগ অবিলম্বে কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশই কাজ করেন মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। এসব দেশেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিদেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাঠানোর দিকেই মনোযোগ বাড়াতে হবে।
সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে যে শ্রমিকরা যান, তারা স্থানীয় ভাষা না জানায় নানা রকম সমস্যা হচ্ছে। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের সত্যিকারভাবে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, আর সে জন্য আধুনিক ও উন্নত সুবিধাসংবলিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা জোরদার এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সস্তা শ্রমের বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারে। এতে অধিক মূল্যসংযোজনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে সবাই।