জনবান্ধব প্রশাসনের বিকল্প নেই

মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান

সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক পালাবদল, ক্ষমতা পরিবর্তন উন্নয়ন যেমন হয়েছে তেমন হয়েছে দুর্নীতি। এস আলম, পিকে হালদার আরও দীর্ঘনাম যুক্ত হতে পারে এই

2024-12-30T00:57:22+00:00
2024-12-30T00:57:22+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
জনবান্ধব প্রশাসনের বিকল্প নেই
মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪, ১২:৫৭ এএম   (ভিজিট : ৫১৬)
জনবান্ধব প্রশাসনের বিকল্প নেই
রাজনৈতিক পালাবদল, ক্ষমতা পরিবর্তন উন্নয়ন যেমন হয়েছে তেমন হয়েছে দুর্নীতি। এস আলম, পিকে হালদার আরও দীর্ঘনাম যুক্ত হতে পারে এই তালিকায়। যারা ব্যাংক দখল, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী হুন্ডিবাজি, শেয়ার কেলেঙ্কারিতে খেলোয়াড়।

দেশের জনগণের করের অর্থ আত্মসাৎ করে এরা নামে-বেনামে ব্যাংকে দেশের ভেতরে-বাইরে অর্থ জমা করেছে শুধুমাত্র নয়। বিদেশে অসংখ্য গাড়ি, বাড়ি, নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িত হয়েছে। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র যাত্রা বারবার হোঁচট খেয়েছে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে ওঠেনি বলেই। কেন আমরা পারলাম না। এর পেছনের কার্যকরণ গভীর। তার গভীর অনুসন্ধান করা বিব্রতকর। কথা বলতে গেলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। সেদিকে না গিয়ে যতটা বিশ্লেষণ করা যায় সেটুকু করা সংগত। 

যারা জনবান্ধব কাজে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সফল তারা নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। নিজেদের কুলীন ভাবতেই অভ্যস্ত। ব্রিটিশ আমল থেকে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি ও আইনে গড়ে ওঠা আইন বিধি দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত। অনেক কিছু সংযোজিত হয়েছে। এটা ব্রিটিশ আমলের নবতর সংস্করণ বললেই চলে। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরে নেওয়া যাক একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান আর একটি ফাইল (নথি) মধ্যস্তরের একজন নিয়ে গেলেন। তিনি দ্রুত ফাইল ছাড়লে বোঝায় তার হাতে কোনো কাজ নেই। তিনি কিছু দিন আটকে রাখলেন। পরে পিয়নকে ঘুষ দিয়ে ফাইলটিতে যে বিষয়টি ছিল তা ঊর্ধ্বতন বরাবর পাঠানো সম্ভব হলো। 

তারপরের চক্রে কেবল প্রতিষ্ঠানপ্রধান ঘুরতে থাকবেন। একসময় ফাইল অনুমোদিত হলো ততদিন অর্থ খরচের সময় শেষ। তিনি তড়িঘড়ি করে কিছু কাজ করলেন কিছু কাজ করলেন না। আমার এক বন্ধু এই গল্প আমাকে বলেছিলেন। আমি অবিশ্বাস করিনি। 

এখনও সেই সিস্টেম চালু আছে, কোনো আবেদনপত্র জমা দিলে নিচ থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত যেতে চার-পাঁচ দিন লাগে। তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার মতো একবার নিচে একবার উপরে ওঠার কাজে অনেক দিন লাগে। আবেদনকারীর অপেক্ষা শেষ হয় না। সময় ক্ষেপণ, অর্থ অপচয়, হয়রানি চলতে থাকে। এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? 

ডিজিটাল যুগে আমরা পদার্পণ করেছি। নতুন আশার কিছু ক্ষেত্র তৈরি করলেও দীর্ঘসূত্রতা দূর হয়নি। ই-মেইল করে ফোন করতে হয় আবার। হার্ড কপি পাঠাতেও বলা হয়। সরকারিভাবে তৈরি করা ডোমেইন-অধিকাংশ সময় অ-কার্যকর থাকে। ই-টেন্ডার কিংবা আয়কর রিটার্ন, ভূমিকর দেওয়ার অনলাইন সিস্টেম কতটা সচল? ফলাফল কি সময়মতো পাওয়া যায়। 

যেকোনো দফতরে কাজ করা একটি টিমওয়ার্ক। কেউ বেশি কাজ করে, কেউ কম কাজ করে, কেউ কিছু না করে বাহবা নেয়। কর্তাব্যক্তির অনুগ্রহ পায়। বেশি কাজ করা ব্যক্তিটি অনেক সময় পাদপ্রদীপের আলোয় আসে না। চাটুকার, তোষামোদকারীর পদোন্নতি হয়। সবক্ষেত্রে নয় কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমতো আছেই। এভাবেই চলছে বাংলাদেশ। পে-স্কল আসে, বিপুল অর্থ ব্যয়িত হয়-যে বেশি কাজ করে, যে কম কাজ করে, যে অদক্ষ, যে চাটুকার, যে মোসাহেবি সে পে-স্কেলের বাড়তি সুবিধা পায়। 
২০১৫ সালের সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল আর পে-স্কেল না দেওয়ার। পে-স্কেল দিলে মূল্যস্ফীতি হয়। এর দায়-দায়িত্ব কার? রাষ্ট্র, জনগণ, আমলা, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদদের সম্মিলিত গোষ্ঠীর মতামত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায় না। সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আশা-আকাংখা ও স্বপ্নপূরণ করে। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা যদি থেকে থাকে তা 
সবার। সফলতাও সবার। বর্তমান সরকার মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। 

অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসন চালায় অল্প কয়েক ব্যক্তি। আমাদের প্রশাসনে অতিরিক্ত জনবল। কেউ ওএসডি, কেউবা বেকার বসে আছে। যারা কাজ করছে তারা অদক্ষ। মিটিং-সিটিং, ভুঁড়িভোজন, বিদেশভ্রমণ কিংবা কীভাবে অর্থ সঞ্চয় করা যায়-এটাই এদের প্রধান লক্ষ্য। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী, সেবক নেই। ফলে সরকার যা করতে চায় তা বাস্তবায়নে বারবার হোঁচট খেতে হয়। উদাহরণ বিস্তর।

কৃষি বিশেষজ্ঞকে দেখি স্বাস্থ্য সচিব, একজন চিকিৎসক কৃষি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। গবেষণা হয় না গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ছাড়া গান-বাজনা, উৎসব হয়। কী অব্যবস্থাপনা যে চলে, এর উত্তর কে দেবে? 

যে কোটা নিয়ে আন্দোলন সেখানেও রয়েছে বৈষম্য। ৫০ শতাংশ কোটা উপসচিব পদের জন্য নিধাঁরিত। তাও নাকি কম। গাড়ি, ঋণ অন্যান্য সুবিধা এসব তো আছেই। উঁচু পদধারীর স্ত্রী, স্বামী বিশেষ প্রটোকল পেয়ে যান। গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের কমিটিতে তাদের স্থান হয় অনায়াসে। পৃথিবীর অন্য দেশে এসব হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। সব সম্ভবের এ দেশে কী না হয়? 

কোটাভিত্তিতে নিয়োজিত আমলাদের পদোন্নতি বেশি ঘটে। কোটাবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল এ সরকার। প্রশাসনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বসে আছে ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবাহী। তাদের কারণে সরকার করতে পারছে না জনবান্ধব কাজ। দুর্নীতি অনিয়ম অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে শুধু রাজনীতিবিদসহ কিছু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও নাম আসছে। সহযোগী আমলা ও আমলাতন্ত্রের যে বড় ভূমিকা রয়েছে তা প্রমাণিত হবে কী? 

এ মুহূর্তে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ প্রত্যক্ষ করার জন্য জনগণ উদগ্রীব অপেক্ষা করছে।  নতুন এই কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে কী? যদি কারও কর্মকাণ্ড সন্তোষজনক না হয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সংগত। কিন্তু যারা আমলা তারা এমন নিগড়ে বাঁধা তাদের অবস্থান থেকে তাদের বিয়োগ করা সময়সাপেক্ষ, তাদের স্পর্শ করে এমন শক্তি কারও আছে? সবাই ঢাকায় থাকতে চায়।

ঢাকা একটি শহর। হাজারো শহর গ্রাম মিলে বাংলাদেশ। সমগ্র শহর/গ্রাম না বদলাতে পারলে বাংলাদেশের সমগ্র চেহারা বদলাবে না। আমরা চাই স্বপ্নঘেরা বাংলাদেশ। সবাইকে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।একটি জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে যেকোনো মূল্যে। ব্যর্থ হলে আবার জাতীয় জীবনে অন্ধকার নেমে আসবে। 

প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/আরএস/



Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: