মুসলমানের জীবনে নামাজ একটি আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। প্রতিদিন প্রত্যেক মুসলমানকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয়। ঘরে-বাইরে কখনো নামাজ পরিত্যাগের সুযোগ নেই। নামাজের গুরুত্ব পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কেয়ামতের দিন জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে-‘কোন জিনিস তোমাদের জাহান্নামে টেনে আনল? উত্তরে তারা বলবে, আমরা দুনিয়াতে নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’ (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত : ৪২)।’
আর নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম যেই জিনিসের হিসাব নেওয়া হবে সেটি হলো নামাজ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৯)।’ নামাজ এমন পবিত্র ও মহিমান্বিত ইবাদত, যা আল্লাহ আল্লাহ তায়ালা তাঁর হাবিব মুহাম্মাদ (সা.)-কে মেরাজের রাতে সপ্তম আসমান পরিভ্রমণ করিয়ে আরশে আজিমের মেহমান বানিয়ে উম্মতের জন্য উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন।
এসব কারণে স্বভাবিকভাবেই নামাজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য দৈনন্দিন সব ইবাদত মসজিদে গিয়ে আদায় করা সম্ভব না। অন্যদিকে মহানবী (সা.)-ও ঘরকে ইবাদত ও জিকিরশূন্য রাখতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না’ (তিরমিজি : ২৮৭৭)।’ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘তোমরা ঘরকে তেলাওয়াত ও নামাজশূন্য করে শুধু ঘুমানোর স্থান বানিয়ে ফেলো না। কেননা ঘুম আর মৃত্যু হলো সহোদর ভাইয়ের মতো। মৃত ব্যক্তি তো কুরআন পড়ে না, নামাজও আদায় করে না (ফাতহুল বারি : ১/৫২৯)।’ মসজিদের পরিবেশে রাত জেগে পড়ার সুযোগ সবার হয় না। তাই ঘরোয়াভাবে মসজিদের মতো একটি পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া উত্তম। আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, ‘ঘরের মধ্যে নফল নামাজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা মুস্তাহাব।’ (হাশিয়া ইবনু আবিদিন : ২/৪৮৫)
ফিকহের কিতাবে আছে, আমাদের নামাজ প্রধানত দুই প্রকার-১. ফরজ। ২. নফল। আমাদের নফল নামাজগুলো আমরা ঘরে আদায় করতে পারব সবসময়। হজরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত-এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘নবীজি (সা.) এক রমজানে নামাজের জন্য ঘরের কোণে একটি অংশ নামাজের স্থান বানালেন। রাতের নামাজগুলো তিনি সেখানেই আদায় করতেন। অতঃপর তাঁকে অনুসরণ করে সাহাবায়ে কেরামও রাতের নফল নামাজগুলো ঘরে আদায় করতে লাগলেন।
তখন নবীজি (সা.) সবাইকে ডেকে বললেন-আমার অনুকরণে তোমরা যা করেছো তা আমি দেখেছি। তোমরা তোমাদের নফল নামাজগুলো ঘরে আদায় করো। কারণ মানুষের সর্বোত্তম নামাজ ওইটিই; যা সে ঘরে আদায় করে, তবে ফরজ নামাজ ব্যতীত।’ (মুসলিম : ৭৮১)
মাহমুদ ইবনু রাবি আনসারি (রহ.) থেকে বর্ণিত, বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যতম আনসারি সাহাবি ইতবান ইবনু মালিক (রা.) আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছে। আমি আমার গোত্রের লোকদের নিয়ে নামাজ আদায় করি। কিন্তু বৃষ্টি হলে আমার ও তাদের বাসস্থানের মধ্যবর্তী নিম্নভূমিতে পানি জমে যাওয়াতে তা পার হয়ে মসজিদে পৌঁছাতে পারি না এবং তাদের নিয়ে নামাজ আদায় করতে পারি না।
আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আপনি আমার ঘরে এসে কোনো এক স্থানে নামাজ আদায় করেন এবং আমি সেই স্থানকে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেব। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ অচিরেই আমি তা করব। ইতবান (রা.) বলেন, ‘পরদিন সূর্যোদয়ের পর আল্লাহর রাসুল (সা.) ও আবু বকর (রা.) আমার ঘরে তাশরিফ আনেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম।
ঘরে প্রবেশ করে তিনি না বসেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ঘরের কোন স্থানে নামাজ আদায় করা পছন্দ করো? তিনি বলেন, আমি তাঁকে ঘরের এক প্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করলাম। অতঃপর আল্লাহর রাসুল (সা.) দাঁড়ালেন এবং তাকবির বললেন। তখন আমরাও দাঁড়ালাম এবং কাতারবন্দি হলাম। তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ে সালাম ফেরালেন (বুখারি, হাদিস : ৪২৫)। এ ছাড়াও আবুবকর (রা.) ও আয়েশা (রা.) থেকে ঘরোয়া মসজিদ-সংক্রান্ত হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
ঘরে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখলে সেখানে নামাজ পড়ে আলাদা প্রশান্তি অনুভব হয়। পরিবারের সবার মধ্যে নামাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে সবার মধ্যে নিয়মিত নামাজের একটা অভ্যাস গড়ে উঠবে এবং অজস্র রহমত ও বরকত নেমে আসবে আমাদের সবার পরিবারে। কারণ নবীজি (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন-‘যে ঘরে নামাজ আদায় করা হয় সেই ঘরে আল্লাহ তায়ালা বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ করেন’ (মুসলিম : ৭৭৮)। আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন।