ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো আনুগত্য। নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছাড়া পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা আসবে না। সর্বত্রই দেখা দেয় সীমাহীন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। অস্থির হয়ে ওঠে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব। তাই ইসলামে আনুগত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। আনুগত্যের ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে বিশদ আলোচনা রয়েছে। যেমন- আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসুল (সা.)-এর এবং তোমাদের মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ো, তা হলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি প্রত্যর্পণ করো, যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম’ (সুরা নিসা : ৫৯)। এ আয়াতে ‘উলুল আমর’ বা নেতৃস্থানীয়দের আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘উলুল আমর’ সেই সব ব্যক্তি, যারা মুসলিম সমাজের পরিচালক। আলেম-উলামা, ন্যায়সংগত শাসক, বিচারপতি এবং সর্দারসহ নেতা-সেনাপতি সবাই ‘উলুল আমরে’র মধ্যে গণ্য।
ইসলাম আনুগত্যের সীমাহীন গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তার সীমারেখাও টেনে দিয়েছে মজবুতভাবে। প্রথম শর্ত হচ্ছে, ইসলামবিরোধী কাজে কারও আনুগত্য করা যাবে না। আমির বা নেতার আদেশ ততক্ষণ মানা যাবে, যতক্ষণ তিনি ইসলামের সীমার ভেতর থাকেন। ইসলামবিরোধী কাজে কারও আনুগত্যের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিজেদের নেতাদের কথা শোনা ও মেনে চলা মুসলমানের জন্য অপরিহার্য, তা তার পছন্দ হোক বা না হোক, যে পর্যন্ত না তাকে গুনাহ ও নাফরমানির হুকুম দেওয়া হয়। আর যখন তাকে নাফরমানির হুকুম দেওয়া হয়, তখন তার সে হুকুম শোনা ও আনুগত্য করার অবকাশ নেই’ (বুখারি : ৭১৪৪)। দ্বিতীয়ত আনুগত্যের মানদণ্ড দ্বীনদারি ও যোগ্যতা। আনুগত্যের প্রশ্নে ইসলাম ব্যক্তি বা বংশকে প্রাধান্য দেয়নি। প্রাধান্য দিয়েছে দ্বীনদারি, যোগ্যতা ও ন্যায়ানুগতাকে। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘যদি তোমাদের নেতা হিসেবে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের নেতৃত্ব দেয়, তা হলে তার কথা শোনো এবং আনুগত্য করো।’ (মুসলিম : ১৮৩৮)
ইসলামে কারও অন্ধ অনুকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে কোনো কিছুর অন্ধ অনুকরণ ইসলামে অনুমোদিত নয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তাঁর দিকে এবং রাসুল (সা.)-এর দিকে। তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যার ওপর পেয়েছি তা-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছু না জানে এবং সুপথপ্রাপ্ত না হয়, তার পরও তারা তাদের অনুসরণ করবে?’ (সুরা মায়িদা : ১০৪)। আনুগত্যহীনতার কিছু কারণ রয়েছেÑ১. আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ২. আনুগত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতা। ৩. গর্ব ও অহংকার। ৪. হিংসা ও বিদ্বেষ। ৫. সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি মনোভাব। ৬. মেজাজের ভারসাম্যহীনতা। ৭. পদের প্রতি মোহ। ৮. দায়িত্বশীল পছন্দ না হওয়া। ৯. দায়িত্বশীলের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক। ১০. দায়িত্বশীলের ব্যাপারে সন্দেহ প্রবণতা। ১১. নিজের মতামতে ছাড় দিতে না পারা। ১২. হৃদয়ের বক্রতা। ১৩. মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্ন করার প্রবণতা। ১৪. নিজেকে অন্যের চেয়ে যোগ্য মনে করা। ১৫. সুযোগসন্ধানী ও জাগতিক লাভের মনোভাব। আল্লাহ সবাইকে এসব থেকে হেফাজত করুন।
সময়ের আলো/জেডআই